কলকাতায় দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু

Published
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

কলকাতায় একটি খ্যাতনাম দুর্গাপুজো মন্ডপে পদপিষ্ট হয়ে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন। তিনি জানান, আরও ২৫ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর।

কলকাতা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৭ই অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিট নাগাদ কলকাতার গিরিশ পার্ক থানা এলাকার চোরবাগানের পুজো মণ্ডপের বের হওয়ার গেটে পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত ও আহতদের পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে। তাদের অনেকেই কলকাতার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে পুজো দেখতে এসেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঘটনাস্থলের পাশে কোনো ভবন থেকে ধারণ করা একটি ভিডিও তৃণমূল কংগ্রেস নেতা কুনাল ঘোষ সহ বহু মানুষ শেয়ার করছেন সামাজিক মাধ্যমে।

ওই ভিডিওটি কিছুটা অস্পষ্ট, তবে সেখানে যে অনেকে মাটিতে পড়ে আছেন সেটা বোঝা যাচ্ছে এবং আর্ত চিৎকারও শোনা যাচ্ছে।

পুলিশ চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্গাপুজো মন্ডপটি সিল করে দিয়েছে।

ঘটনার পরে মণ্ডপে পুজো কমিটির কোনও সদস্যকে দেখা যায়নি।

এই পুজোটি উত্তর কলকাতার একটি বড় বাজেটের পুজো।

পুলিশ সূত্রগুলি নিশ্চিত করেছে যে কলকাতার আরও তিনটি বড় ও খ্যাতনামা পুজোতে দর্শকদের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া আরেকটি বড় পুজো, যেখানে ব্যাপক ভিড় হচ্ছিল কদিন ধরেই, সেটির উদ্যোক্তারা নিজে থেকেই দর্শকদের ফিরে যাওয়ার কথা ঘোষণা করছে।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে একটি টোল ফ্রি হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে যান। রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ও হাসপাতালে যান।

কীভাবে দূর্ঘটনা?

প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে যেসব বয়ান পাওয়া গেছে, তা অনুযায়ী, সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে হাজার হাজার মানুষের ভিড় হয়েছিল। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে বহু মানুষ সরু রাস্তা ও গলির মধ্যে অবস্থিত এই পুজো মণ্ডপের ভিতরে আশ্রয় নিতে ছুটে যান।

অন্য দিকে, মণ্ডপের ভিতরে থাকা দর্শনার্থীরা বাইরে বেরোতে পারছিলেন না। বাইরে বৃষ্টির মধ্যে আটকে পড়া মানুষও ভিতরে ঢোকার জন্য ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। এর জেরে অস্থায়ী সিঁড়ির উপর হুড়োহুড়িতে মানুষ একে অপরের গায়ের উপর পড়ে যান।

মণ্ডপে লোহার কাঠামোর নীচে দুর্গাপ্রতিমা রাখা ছিল। ওই কাঠামোর একটি অংশ ভেঙে পড়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এখনও পর্যন্ত প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে পাওয়া বিবরণ অনুযায়ী, গোটা ঘটনাটি পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মধ্যে ঘটে থাকতে পারে।

অব্যবস্থার অভিযোগ

চোরবাগান সর্বজনীনের পুজো এবছর ৯১ বছরে পা দিয়েছে। মণ্ডপে ঢোকার জন্য একটি সরু গলি রয়েছে। পাঁচ দিন আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই মণ্ডপের উদ্বোধন করেছিলেন।

মণ্ডপের আশপাশে রাস্তায় ভিড় সামলানোর জন্য হাতে গোনা কয়েক জন স্বেচ্ছাসেবী বা ভলান্টিয়ার ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। একটি গলি ভিআইপি-দের যাতায়াতের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সাধারণ দর্শনার্থীদের বেরোনোর অন্য পথটিতে রাস্তার প্রস্থ কোথাও ১০ ফুট, কোথাও ৩০ ফুটের মতো ছিল। সিঁড়ি পেরিয়ে যারা বেরোনোর গেট পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন, তারাও বাইরে বেরোতে পারছিলেন না।

মণ্ডপে উপস্থিত এক দর্শনার্থীর অভিযোগ, "পাশের পার্বতী ঘোষ লেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কোনও অ্যাম্বুল্যান্স ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পুলিশও চলে গিয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে এসে ভিতরে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন।"

আর এক দর্শনার্থী জানান, মণ্ডপ দেখতে আসা তার তিন বন্ধু মাটিতে পড়ে যান। তিনি তাদের টেনে তোলার চেষ্টা করেও পারেননি। পরে আরও কয়েক জন এগিয়ে এসে তাদের টেনে বার করার চেষ্টা করেন।

এর আগে ২০১৫ সালে দক্ষিণ কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কের দুর্গাপুজোয় পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনায় প্রায় ১১ জন আহত হওয়ার পর পুজো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সমবেদনা প্রকাশ

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত এসিপির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার ঘোষণা এবং কিছু হুইসেল বাজানোর পর এই ঘটনার সূত্রপাত হয়।

তিনি বলেন, "মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আমি কোনো বিবৃতি দিতে পারি না, তবে আমি আশ্বাস দিচ্ছি যে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে যথাযথ তদন্ত করা হবে। পুজো কমিটির সদস্য এবং নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের আটক করা হয়েছে। সকল পরিবারকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হবে।"

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সন্ধ্যায় পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী কলকাতায় এসে পৌঁছেছেন। তিনি এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, "এইমাত্র চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে একাধিক মানুষের হতাহতের অত্যন্ত দুঃখজনক খবর পেয়েছি। এই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী শ্রী শুভেন্দু অধিকারী মহাশয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। আহতদের সর্বোত্তম চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে প্রশাসন।"

রোববার পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজোয় অংশ নিতে আসার পূর্ব পরিকল্পনা ছিল অমিত শাহর। তিনি জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে আগামীকালের তার সমস্ত কর্মসূচি স্থগিত করে আহতদের সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করতে যাবেন।

ঘটনার পর এক্স হ্যান্ডেলে সমবেদনা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও।

তার দফতর থেকে এক্স হ্যান্ডেলে জানানো হয়েছে যে এই ঘটনায় নিহতদের নিকটাত্মীয়দের প্রত্যেককে দুই লক্ষ টাকা করে এবং আহতদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে।