কলকাতা ও আশেপাশে এবারে কোরবানির ঈদ কতটা অন্যরকম ছিল?

- Author, রূপসা সেনগুপ্ত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
- Published
- পড়ার সময়: ৭ মিনিট
"ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে রেড রোডে নামাজ পড়তে আসতাম। আমার তখন ১০ বছর বয়স হবে। ব্রিগেডে অনেকটা জায়গা আছে। কিন্তু কী জানেন, ঈদের সকালে রেড রোডে নামাজ পড়াটা অভ্যেসের মতো ছিল," কথাগুলো বলছিলেন কলকাতার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন।
চলতি বছর শহরে রেড রোডের বদলে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হয়েছে কোরবানির ঈদ উপলক্ষে নামাজের অনুষ্ঠান।
ঘড়ি ধরে ঠিক সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ নামাজ শুরু হওয়ার আগে ছায়ায় বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ও তার বন্ধু মোহম্মদ শাহিদ। তখনই কথাগুলো বলেন মি. সাহাবুদ্দিন।
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে পর বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার যার একটা হলো, ঈদের দিনের নামাজ কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে রেড রোডে না করে কাছেই ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের মাঠে আয়োজন করা।
সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন কঠোরভাবে বলবৎ করা এবং রাস্তা আটকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বন্ধ করার মতো বিষয়ও রয়েছে।
ঈদের দিনে কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় মসজিদের বাইরে কড়া পুলিশি নজরদারির কথাও জানা গেছে।

১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইনে গরু, মহিষ, ষাঁড়, বলদ ইত্যাদি পশুর জবাইয়ের জন্য বয়স ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় শংসাপত্র বা সার্টিফিকেট, পৌরসভা বা প্রশাসন নির্ধারিত কসাইখানায় পশু কাটা এবং প্রকাশ্যে জবাই না করার মতো একাধিক বিষয়ে বিধিনিষেধের উল্লেখ করা আছে।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
কোরবানির ঈদের আগে সরকারের এই পদক্ষেপ নিয়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এর প্রভাব কোরবানির ঈদের আগে গরু বিক্রিতে পড়বে বলেও আশঙ্কা করেছিলেন অনেকে।
বাস্তবেও দেখা গেছে, চলতি বছরে গরু বিক্রিতে ভাঁটা পড়েছে। ভয়ে বা আশঙ্কায় অনেকেই এবারে গরু বেচাকেনা করতে সাহস পাননি, জানিয়েছেন ব্যবসায়ী এবং ক্রেতা দুই পক্ষই।
একইভাবে রাস্তা আটকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়েও আপত্তি জানিয়েছিলেন অনেকে।
রাস্তায় নামাজ না পড়তে দেওয়ার বিরোধিতা জানিয়ে কলকাতায় বিক্ষোভও দেখা গিয়েছিল। এই সমস্ত কিছুর মাঝেই বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হলো কোরবানির ঈদ।
চলতি বছরে কলকাতায় ঈদের নামাজ পড়ার অনুষ্ঠানে যে সমস্ত বদল লক্ষ্য করা গিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম রেড রোডের বদলে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থানান্তর। রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও প্রায় কোথাওই রাস্তায় নামাজ পড়তে দেখা যায়নি।
বিগত তৃণমূল কংগ্রেস আমলে তখনকার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীকে রেড রোডে ঈদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দেখা যেত – যদিও সেটা মূলত ঘটত রোজার ঈদের নামাজে, কোরবানির ঈদে নয়। অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি, তাকে সেখানে রাজনৈতিক মন্তব্যও করতে শোনা যেত।
এবারে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ঈদের নামাজে অবশ্য কোনো নেতা-মন্ত্রীকেই দেখা যায়নি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
জায়গা বদল
ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে কোরবানির ঈদের অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবস্থা আগেই শুরু হয়েছিল। অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ব্যক্তিদের যাতে অসুবিধা না হয়, তার জন্য ব্যবস্থা করা হয়। উপস্থিত ছিল পর্যাপ্ত পুলিশ ও ভলান্টিয়ার্স বা স্বেচ্ছাসেবক।
নামাজ পড়তে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই এই নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন, অনেকে আবার রেড রোডে নামাজের প্রসঙ্গ টেনে নস্টালজিয়ায় ভুগেছেন। তাদেরই একজন মোহম্মদ সোহেল।
তার কথায়, "আমি ঝাড়খণ্ড থেকে কলকাতায় এসেছিলাম ২৫ বছর আগে। তখন থেকেই ঈদের দিন সকালে উঠে নামাজ পড়তে আসতাম রেড রোডে।"
"এখানে (ব্রিগেডে) জায়গা অনেকটা, বড় জমায়েত হলে সুবিধা হবে, ট্র্যাফিকের সমস্যা হবে না ঠিকই। কিন্তু রেড রোড থেকে ঈদের অনুষ্ঠান সরছে শুনে খারাপ লেগেছিল," বিবিসিকে বলছিলেন তিনি।

তালতলার এই বাসিন্দা জানিয়েছেন, এবছর বাড়ির কাছের একটা মসজিদেই নামাজ পড়েছেন।
তার কথায়, "বুঝতে পারছিলাম না কী হবে। তাই পাড়ার মসজিদে নামাজ পড়ে নিয়েছি।"
তারই মতো নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারুকও ঠিক করেছিলেন বাড়ির কাছের মসজিদে নামাজ পড়বেন।
তিনি বলছিলেন, "ব্রিগেডে দেখতে এসেছি কী হচ্ছে। যদি সবকিছু ঠিকঠাক হয়, তাহলে পরের বার আসব। এখানে একটা বড় সুবিধা হলো নামাজের জায়গা নিয়ে ভাবতে হবে না। আগে রেড রোডে সকাল সকাল এসে জায়গা ঠিক করতে হতো। গাড়ি চলাচলেও অসুবিধা হতো।"
রেড রোডে নামাজ নিয়ে গত বছরই আপত্তি জানিয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী। ব্রিগেড সমেত কলকাতার এই রাস্তা সেনাবাহিনীর অধীনে।
পরে তখনকার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর হস্তক্ষেপে রেড রোডে ঈদের অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া হয়।
চলতি বছরে কলকাতা পুলিশ এই অনুষ্ঠানের আয়োজক 'ক্যালকাটা খিলাফত কমিটি'কে আগেই একটা বিকল্প জায়গা খোঁজার কথা জানিয়েছিল।
বিপুল জমায়েতের কথা মাথায় রেখে শেষ পর্যন্ত কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডকে বেছে নেওয়া হয়। সেনাবাহিনীও এতে অনুমতি দেয়।
ওই কমিটির পক্ষ থেকে মোহাম্মদ খলিল বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "দীর্ঘদিন ধরে রেড রোডেই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে নামাজ। তার আগে মনুমেন্ট (শহীদ মিনার) সংলগ্ন মাঠে নামাজ পড়া হতো। কিন্তু সেখানে বৃষ্টির কারণে জল জমায় রেড রোডে নামাজ পড়া শুরু হয়েছিল।"

"অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার কম মানুষ এসেছেন। অনেকে ভেবেছেন রেড রোডের বদলে নতুন জায়গায় যদি সমস্যা হয়। কেউ আবার গরু কোরবানি দিতে পারবেন না বলে ঈদে অন্যত্র চলে গেছেন," বলছিলেন মোহাম্মদ খলিল।
ঈদের দিনের কথা বলতে গিয়ে তারই মতো অনেকে রাজনৈতিক পালাবদলের পর 'পরিবর্তিত পরিস্থিতি'র কথা বলেছেন।
হুসেন নামে পিকনিক গার্ডেনের এক যুবক আবার বলছিলেন, "নিয়ম মেনে ঈদ মানাচ্ছি, নামাজ পড়ছি। আশা করব অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানও রাস্তা আটকে আর হবে না।"
এই সমস্ত পরিবর্তনের বিষয়ে অবশ্য কিছুই জানেন না উসমান শেখু ও তার স্ত্রী। নাইজেরিয়া থেকে আসা এই দম্পতিও বৃহস্পতিবার ব্রিগেডের নামাজের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন।
মি. শেখু বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমি কলকাতার এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিজিক্স নিয়ে পিএইচডি করছি। গত তিন বছর ধরে কলকাতাতেই ঈদের নামাজ পড়ি। এখানে একসঙ্গে এত মানুষের জমায়েত হয়। খুব ভালো লাগে।"

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images
রাজনৈতিক রঙ
মমতা ব্যানার্জী ক্ষমতায় আসার পর কোভিডের সময়টুকু বাদ দিলে তাকে বিশেষ করে রোজার ঈদের অনুষ্ঠানে নিয়মিত যোগ দিতে দেখা গিয়েছে। এই মঞ্চ থেকে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা যেমন দিয়েছেন, তেমন আবার রাজনৈতিক মন্তব্যও করেছেন।
বেশ কয়েকবার বিরোধীদের উদ্দেশ্যে কড়া বার্তা দিতে দেখা গিয়েছে তাকে যা ঘিরে বিতর্কও বেঁধেছে। গত কয়েক বছরে অবশ্য তার পাশে দেখা গিয়েছে অভিষেক ব্যানার্জীকেও।
১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বামফ্রন্ট আমলে কিন্তু এমন নজির দেখা যায়নি।
চলতি বছরে কলকাতার ঈদের নামাজের আয়োজনে অন্য ছবি চোখে পড়েছে।
রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী দু'জনেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোরবানির ঈদ উপলক্ষে শুভেচ্ছা বার্তা জানিয়েছেন।
মোটের উপর রাজনৈতিক স্পর্শ থেকে দূরেই ছিল ব্রিগেডের এই আয়োজন। তৃণমূল কংগ্রেস নেতা এবং 'ক্যালকাটা খিলাফত কমিটি'র সভাপতি জাভেদ আহমেদ খান সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, "ব্রিগেডে অনেকটা জায়গা, নিয়ম মেনেই সমস্ত ব্যবস্থা হয়েছে। সবকিছু ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কোনো সমস্যা নেই।"
ঈদ জামাতে অংশ নেওয়া একজনকে বিজেপিপন্থি দাবি করে কেউ কেউ রাজনৈতিক স্লোগান দিলেও আয়োজকরা এই আয়োজনকে ধর্মীয় পরিসরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার জন্য ক্রমাগত অনুরোধ জানিয়েছেন।

বিভিন্ন মসজিদের বাইরে পুলিশি পাহারা
আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে কড়া পুলিশি নজরদারি রাখা হয়েছে। কলকাতাতেও একই চিত্র ধরা পড়েছে।
কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদের বাইরে বিপুল পরিমাণ পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা ছিল।
নরেন্দ্রপুরের বাসিন্দা মহিউদ্দিন লস্কর বিবিসিকে জানিয়েছেন তার এলাকায় মসজিদের বাইরে বিপুল পরিমাণে পুলিশ নজরদারি ছিল। এমনটা তিনি এর আগে দেখেননি।
"শুধু পুলিশ নয়, প্রচুর সিআরপিএফ জওয়ানও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের স্থানীয় মসজিদের বাইরে মোতায়েন ছিল। এলাকায় সম্পূর্ণ শান্তি ছিল, তবু তাদের কেন পাঠানো হয়েছিল মাথায় ঢুকলো না," বলছিলেন তিনি।
সকাল সকাল নামাজ পড়ার পর ছেলের সঙ্গে বেরিয়েছিলেন মোহম্মদ হুসেন। কলকাতার মল্লিক বাজারে এসেছিলেন একটা কাজে।
তিনি বললেন, "আজ রাস্তা ঘাটে ভিড় নেই, ট্র্যাফিক নেই ঠিকই কিন্তু কিছু একটা যেন মিসিং। আগের মতো নেই।"
কেন একথা বলছেন জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলেন, "এবারে অনেক পাবন্ধি (বিধিনিষেধ) রয়েছে।"
চলতি বছরে কী পরিবর্তন চোখে পড়েছে জিজ্ঞাসা করায় দক্ষিণ ২৪ পরগণার খলিল আহমেদ আবার বিষয়টাকে অন্যভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
তার কথায়, "সবাই নামাজ আর গরু কোরবানির কথা বলছে, পজিটিভ পরিবর্তনও তো আছে। এই প্রথম ঈদের নামাজের অনুষ্ঠানকে কেউ রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করেনি।"

'ঘরছাড়া লোকগুলো কোথায় আছে কে জানে'
চলতি বছরের ঈদ তপসিয়ার টালিখোলা মসজিদ লাগোয়া অঞ্চলের একাধিক বাসিন্দার জন্য একেবারে আলাদা ছিল।
এই এলাকার একটি ভবনে সম্প্রতি আগুন লেগে চামড়ার ব্যাগ তৈরির কারখানার দুজন কর্মীর মৃত্যু হয় এবং তিনজন আহত হন।
তারপরই নিয়ম বহির্ভূতভাবে ওই ভবন তৈরি হয়েছিল এবং কারখানা চলছিল, এই অভিযোগ তোলা হয়।
তারপর সেই ইমারত এবং তার লাগোয়া ভবন ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেয় সরকার। তার আগে ওই ভবনের আবাসিকদের বাড়ি ছাড়তে বলা হয়।
হাই কোর্টের হস্তক্ষেপে সেই ভাঙার কাজ স্থগিত থাকলেও ওই ভবনে যে আবাসিকরা থাকতেন তাদের ঘর ছাড়তে হয়েছে।
বর্তমানে পরিত্যক্ত ওই ভবনের ঠিক নিচেই আতরের দোকান চালান মোহাম্মদ জুনেইদ। তিনি বলেছেন, "এই বাড়িতে অনেকগুলো পরিবার থাকত তারা কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে কে জানে।"
বৃহস্পতিবার তপসিয়ার ওই অঞ্চলের রাস্তাঘাটে অন্যান্য বছরের তুলনায় ছবিটা ভিন্ন।
মোহাম্মদ জুনেইদ বলেছেন, "অন্যান্য বছর এই রাস্তায় খুব ভিড় হতো, কিন্তু এই বছর লোক কম।"
পেশায় রিক্সাচালক এক স্থানীয় ব্যক্তি বলছিলেন, "কদিন আগে পর্যন্ত এখানে পুলিশের কড়া পাহারা ছিল, মিডিয়া ছিল। আজ পরিবেশ শান্ত, কিন্তু যাদের মাথার ছাদ গেল, তাদের কী হবে?"








