আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ঢাকায় বিমানবন্দরে মরদেহ ছাড় করাতে বিলম্ব, হেনস্তার অভিযোগ কতটা সত্যি
- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের ওমর ফারুক সৌদি আরবের রিয়াদে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন। কয়েকদিনের তৎপরতায় ও দূতাবাস কর্মকর্তাদের সহায়তায় তার মরদেহ ঢাকায় এসে পৌঁছেছিল গত ডিসেম্বরের একদিন রাত দুটায়। সেই মরদেহ তার স্বজনরা ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বুঝে পেয়েছিল পরদিন বেলা চারটায়।
"ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে লাশ নিতেই পারছিলাম না। কাগজের জটিলতা। একবার বলে এটা লাগবে, একবার এই রুম- আরেকবার ওই রুম, চেয়ারম্যানের কাগজ তো ওয়ারিশ সার্টিফিকেট। এমন নানা কাহিনীর কারণে লাশটা এয়ারপোর্টেই ছিল ১৪ ঘণ্টা। এরপর আমরা নিয়ে দাফন করতে পারলাম," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তার ভায়রা নুর ইসলাম।
দুর্ঘটনা ছাড়াও প্রবাসে অনেকের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। সাধারণত বিদেশে বাংলাদেশ মিশন ও বাংলাদেশি কমিউনিটি মরদেহ দেশে পাঠাতে সহায়তা করেন।
কিন্তু মরদেহ ঢাকায় পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর থেকে তা গ্রহণের ক্ষেত্রে মৃতের স্বজনরা জটিলতার মুখে পড়েন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মোঃ আসাদুজ্জামান অবশ্য বিবিসি বাংলাকে বলছেন, প্রবাসী কর্মীদের মরদেহ দেশে এসে পৌঁছানোর পর তা গ্রহণে অহেতুক বিলম্ব কিংবা এই প্রক্রিয়ায় হেনস্থার কোনো সুযোগ এখন আর নেই।
তিনি জানান, বিদেশে কোনো প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর হলে যেভাবেই তিনি মৃত্যুবরণ করুন না কেন দেশে আসা মাত্রই মরদেহ পরিবারকে হস্তান্তর এবং প্রতিটি পরিবারকে ৩৫ হাজার টাকার চেক তাৎক্ষণিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
তারপরেও অভিযোগ কেন
গত ১৮ই এপ্রিল ভিন্ন-ভিন্ন ফ্লাইটে কুয়েত, মালয়েশিয়া ও লিবিয়া থেকে ৩৪ জন প্রবাসী বাংলাদেশির মরদেহ ঢাকায় এসে পৌঁছানোর তথ্য দিয়েছিল প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল যে, "এই ৩৪ জনের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মরদেহগুলো দীর্ঘদিন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে আটকে ছিল।"
ওই বিজ্ঞপ্তিতেই বলা হয়েছিল যে, মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সময় সরকারের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে দাফন ও অন্যান্য খরচ বাবদ প্রতিটি পরিবারকে ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
যদিও সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সাথে কাজ করেছেন এমন অনেকে ধারণা দিয়েছেন যে, সাধারণত গ্রাম এলাকা থেকে লোকজন স্বজনদের মরদেহ গ্রহণ করতে এসে কিছুটা বিপাকে পড়েন।
"অনেক সময় তারা প্রক্রিয়াগুলো বুঝতে পারেন না। বিশেষ করে কিছু কাগজপত্র জমা দিতে হয় যেগুলো নিয়ে অনেক সময় সমস্যা তৈরি হয়। এর সুযোগ নেয় বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা একটি চক্র। তবে সরকারি সংস্থা কিংবা অভিবাসন নিয়ে সহায়তা করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর নজরে এলে তারা সহায়তা করে থাকেন। বিশেষ করে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা বিএমইটির সার্টিফিকেট যাদের থাকে তাদের মরদেহ স্বজনদের নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যাই হয় না" বলছিলেন একজন কর্মকর্তা।
মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রবাসী কর্মীদের মরদেহ গ্রহণে সহযোগিতার পাশাপাশি ঢাকায় পোৗঁছানোর পর বিনামূল্যে দেশের যেকোনো প্রান্তে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। "শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দর থেকেও এখন প্রবাসীদের লাশ বিনা খরচে পাঠানো যাবে," বলেছেন একজন কর্মকর্তা।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী প্রবাসী কর্মীদের মৃতদেহ পরিবহনে নতুন দুটি অ্যাম্বুলেন্স যুক্ত করার কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন।
ঢাকায় বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে জানা গেছে, বিমানবন্দরের নির্ধারিত গেইট থেকে মরদেহ গ্রহণ ও লাশ দাফনসহ আনুষঙ্গিক খরচ নির্বাহের জন্য ৩৫ হাজার টাকার চেক পেতে কিছু কাগজপত্র জমা দিতে হয়।
এগুলো হলো- মৃতের পাসপোর্টের ফটোকপি, স্থানীয় চেয়ারম্যান/কমিশনার কর্তৃক দেওয়া ওয়ারিশ সনদ/পারিবারিক সদস্য সনদ, মৃতের স্ত্রী/পিতা/মাতার এনআইডি কার্ডের ফটোকপি, মৃত্যু সনদ এর কপি, বাংলাদেশ দূতাবাসের দেওয়া এনওসি ও এয়ারওয়েজ বিলের মূলকপি।
মূলত এসব কাগজপত্র জমা দিতে গিয়েই বিপত্তিতে পড়েন অনেকে। কারণ সঠিক তথ্য না জানায় অনেকেই প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ছাড়াই মরদেহ সংগ্রহ করতে বিমানবন্দরে এসে হাজির হন।
"এর সুযোগ নেয় দুর্নীতিবাজ একটি চক্র। তারা হয়তো সামান্য একটি পরামর্শ দিয়েও টাকা হাতিয়ে নেয়। ধরেন একজন ওয়ারিশ সনদ আনলো না। দুর্নীতিবাজ চক্রের কেউ হয়তো টাকা নিয়ে বললো চেয়ারম্যানের কাছ থেকে সনদের ছবি আনানোর জন্য। অর্থাৎ তথ্য না জানায় একজন দুর্নীতির শিকার হলো," বলছিলেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা।
অবশ্য আবার অনেকের অভিযোগ হলো, বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যু হলে তার মরদেহ দেশে ফেরত আনার জন্য বিমান ভাড়া সংগ্রহ, দূতাবাসের কাগজপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়া ছাড়াও সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম কানুন পালন করতে হয়। কিছু এয়ারলাইন্স আবার মরদেহ পরিবহন করতে রাজি হয় না।
"এমন ক্ষেত্রে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির পাসপোর্ট নম্বর আমাদের জানালে আমরা সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশে দূতাবাসের লেবার উইংয়ের মাধ্যমে মরদেহ দেশে আনার ক্ষেত্রে সহায়তা করে থাকি। এনওসি থেকে আরম্ভ করে স্বল্পতম সময়ের ফ্লাইটে মরদেহ পাঠাতে দূতাবাস সহায়তা করে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মোঃ আসাদুজ্জামান।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের নুর ইসলাম বলছেন, সৌদি আরবের রিয়াদে তার ভায়রা ওমর ফারুকের মৃত্যুর কয়েকদিন পরে তারা খবরটি পেয়েছিলেন। এরপর কয়েকদিন লেগে গিয়েছিল মরদেহ কই আছে এই খোঁজ পেতেই।
"লাশ কই আছে এটাই জানা যাচ্ছিল না। এরপর লাশ আনতে কী করা লাগে জানি না। এরপর পরিচিত সাংবাদিকের মাধ্যমে রিয়াদে দূতাবাসের কর্মকর্তার সাথে কথা বলার পর লাশ আনার চেষ্টা শুরু হয়। কি যে কয়েকটা দিন গেছে তখন বলে বোঝানো যাবে না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. ইসলাম।
প্রসঙ্গত, সরকারি হিসেবে ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৮১৩ প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছিল। এর আগের বছর দেশে এসেছিল ৪ হাজার ৫৫২ প্রবাসী কর্মীর মরদেহ।
একজন বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যু হলে তার মরদেহ দেশে আনার জন্য ওই দেশে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের অনুমতি, স্থানীয় হাসপাতাল ও পুলিশের কাগজপত্র, এয়ারলাইন্সের অনুমোদন এবং এমবামিং সার্টিফিকেট (স্থানীয় ফিউনারেল হোম বা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান এই কাজ করে থাকে) প্রয়োজন হয়।
আবার মরদেহকে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী পরিবহনের জন্য এয়ারলাইন্সের অনুমোদন ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়।
বাংলাদেশে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়াও চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে। বিমানবন্দরে কাস্টমস ও স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমোদন শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।