আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
'৩৮ বছরে এলাকায় বন্যার এমন পানি দেখি নাই'
এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সারাদেশে টানা বর্ষণের ফলে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পার্বত্য এলাকা বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার আম চাষী চাইথোয়াই অং এবার ব্যবসায় লোকসানের শঙ্কায় দিন গুনছেন।
ওই উপজেলার নতুন পাড়ার বাসিন্দা তিনি। স্থানীয় একজন সাংবাদিকের সহযোগীতায় তার সাথে কথা বলে বিবিসি বাংলা।
তিনি জানান, গত কয়েকদিন ধরে বাড়ি-ঘর, বাগানে পানি ছিল। এখন পানি নামলেও এবার ক্ষতির মুখোমুখি হবেন।
মি. অং বলেন, "বছরের সর্বশেষ আমের সিজনে তিনটি আমের চাষ করি। রুপালী, রাঙ্গুয়ে এবং মল্লিকা। গত কয়েকদিন ধরে পানি থাকায় বাগানেই পচে গেছে আম। এই বন্যার কারণে বিক্রি হয় নাই। ক্ষতি হয়ে যাবে এবার।"
বন্যা আক্রান্ত দেশের সাত জেলার মধ্যে পার্বত্য এলাকাগুলোর কোথাও কোথাও এরই মধ্যে পানি নামতে শুরু করেছে।
যদিও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় স্বল্পমেয়াদী বন্যার শঙ্কার পূর্বাভাস রয়েছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত বান্দরবান জেলার সাথে বিভিন্ন উপজেলার সড়ক যোগাযোগ এখনো ব্যাহত রয়েছে।
এছাড়া এসব জেলার বিভিন্ন স্থানে এখনও পানি বন্দি রয়েছে মানুষ। যেসব স্থানে বন্যার পানি নেমে গেছে সেখানে কোথাও কোথাও বাড়ি-ঘর ভেঙে গেছে। বাসিন্দারা এখন চায় বাড়ি-ঘর মেরামতের প্রয়োজনীয় অর্থ।
বান্দরবান জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ি উপজেলার সড়ক যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
স্থানীয় একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, বান্দরবান জেলা থেকে এসব উপজেলায় এখন সরাসরি যাওয়া যাচ্ছে না। নদীপথে কিংবা সড়কে গেলে ভেঙে ভেঙে একেক যানবাহনে যেতে হচ্ছে।
বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাজমিন আলম তুলি বিবিসি বাংলাকে জানান, "বন্যার পানি আপাতত নেমে গেছে। নদীর উপকূলে চলে গেছে। মানুষের বাড়ি-ঘরে পানি নেই এখন তবে, রাস্তা ও ব্রিজে পানি আছে।"
এই মুহূর্তে বান্দরবান জেলার সাথে এই উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এই উপজেলার তারাফা ইউনিয়ন সংলগ্ন বান্দরবান-রুমা সড়কে বড় ধরনের পাহাড় ধসের কারণে জেলার সাথে যোগাযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন বলে জানান মিজ তুলি।
"তারাফা ইউনিয়ন সংলগ্ন বান্দরবান-রুমা সড়কে বাল্ক এমাউন্টের পাহাড় ধস রয়েছে। সেনাবাহিনী উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে, তারা কাজ করছে। এই উপজেলার প্রধান সড়ক এখন ক্লিয়ার হয়ে গেছে তবে জেলার সাথে যোগাযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন। মানুষ নদীপথে নৌকায় এক উপজেলা থেকে আরেক উপজেলায় চলাচল করছে" বলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ তুলি।
এর আগে শনিবারই চট্টগ্রাম বিভাগের চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ১৬ই জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।
কিন্তু কোন কোন বিভাগে বৃষ্টির পানি জমে থাকার কারণে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার হলে যেতে বেগ পোহাতে হয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ
ঠিক কী পরিস্থিতি পার্বত্য এলাকাগুলোতে
বন্যা আক্রান্ত সাতটি জেলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে।
সোমবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বন্যা সংক্রান্ত সংশোধিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এসব জেলায় পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা এক লাখ ৫৫ হাজারের বেশি এবং ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা ছয় লাখ নয় হাজারের কিছু বেশি।
পার্বত্য জেলাগুলোর মধ্যে বান্দরবান ও কক্সবাজারে পাহাড় ধসের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রোববার পর্যন্ত নিহতের সংখ্যাও বেশি ছিল এই দুই জেলায়।
বন্যা আক্রান্ত সাত জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছে কক্সবাজারে, ৩১ জন।
এছাড়া, রাঙামাটিতে তিনজন, বান্দরবানে ছয়জন, চট্টগ্রামে ১৩ জন এবং মৌলভীবাজারে একজন নিহত হয়েছেন।
বান্দরবানের সাতটি উপজেলার মধ্যে সদর উপজেলা, লামা, আলী কদম ও নাইক্ষ্যংছড়িতে বন্যার পানি একেবারেই নেমে গেছে।
এসব উপজেলায় সড়কে কোথাও কোথাও কিছুটা পানি থাকলেও মানুষের বাড়ি-ঘরে তেমন একটা নেই।
এই জেলায় বন্যার পানিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়িতে সোমবার ভোরে মানুষের বাড়ি-ঘর থেকে পানি নামতে শুরু করেছে।
রোয়াংছড়ি সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মে হ্লা অং মারমা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "পানি কমে গেছে, পানি বিপদসীমার নিচে। পানি কমে যাওয়াতে আশঙ্কা কমে গেছে। প্রথম তিন-চারদিন বৃষ্টি হইছিল তখন পানি ছিল। বিশেষ করে এদিকে চিনিয়ামুখ সাঙ্গু নদীর পাড়ে কিছু এলাকা দুই-তিনদিন ধরে পানি বন্দি ছিল। এখন পানি কমে গেছে, ঘরের ভেতর নাই বললেই চলে আমার ইউনিয়নে।"
তবে, এই উপজেলার বাসিন্দাদের বেশিরভাগই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির। বন্যার সময় আশ্রয় কেন্দ্রে তারা আশ্রয় নেয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
"আমার এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ তেমন একটা যায়নি। যে যার সুবিধামত, কেউ কেউ প্রতিবেশীর ঘরে বা বিহারে বা বৌদ্ধ মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছে। আমরা আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলেছিলাম। ত্রাণ চলমান আছে এখনো" বলেন তিনি।
তিনি জানান, রোয়াংছড়ি উপজেলায় রোববার বিকেল থেকে বন্যার পানি নামা শুরু করার পর থেকে যোগাযোগে কিছুটা সহজ হতে শুরু করেছে।
বান্দরবান জেলার সাথে সড়ক যোগাযোগ এখনো বন্ধ কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "আমাদের পাশেই একটা বাই-রোড আছে, ওখানে পানি কমে যাওয়ায় ওখান দিয়েই বান্দরবান জেলায় যাওয়া যাচ্ছে। প্রধান সড়কে আশেপাশে পাহাড় ধস আছে তবুও কোনভাবে যাওয়া যায়।"
এদিকে, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থা এখন বন্যা পরবর্তী তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
একইসঙ্গে, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ত্রাণ সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
রোয়াংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ তুলি বলেন, "যেসব জায়গায় প্রয়োজন বেশি, পানির অবস্থা বিবেচনা করে সেসব জায়গায় প্রতি পরিবার অনুযায়ী চাল দেয়া হচ্ছে। কেউ দশ কেজি কেউ ১৫ কেজি আবার কেউ এর বেশিও পাচ্ছেন।"
সোমবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে সাতশো শুকনা খাবার ও পানি বিশুদ্ধকরণ ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানান মিজ তুলি।
একইসঙ্গে, বন্যায় মানুষের পাশাপাশি ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার কথা জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ তুলি।
তবে, এখনও ফসলের কী পরিমাণ ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে সেটি নির্ণয় করা হয়নি বলে জানান তিনি।
স্থানীয় একজন সাংবাদিক মংখিং মারমা জানান, সোমবার ভোর সাড়ে তিনটার পর থেকে বন্যার পানি কমা শুরু করেছে।
"সদর উপজেলায় পানি কমার কারণে মানুষজন ঘরে আসা শুরু করছে। উপজেলা পর্যায়ে আমরা এখনো পর্যন্ত মুভ করতে পারছি না কারণটা হলো বিভিন্ন জায়গায় সড়কের ওপরে পাহাড় ধসে সড়ক যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন। রুমা, থানচি ও রুয়াংছড়ি এই তিন উপজেলায় পাহাড় ধসের কারণে সড়ক যোগাযোগ এখনো স্বাভাবিক হয়নি।"
একইসঙ্গে এসব উপজেলায় বিদ্যুতে সংযোগ পুনরায় দেওয়ার জন্য পিডিবি কাজ করছে বলে জানান তিনি।
এছাড়া লামা ও আলী কদম উপজেলা থেকেও পানি নামতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এর মধ্যে লামা পৌর এলাকার দুইটি ইউনিয়ন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এগুলো হলো রুপসী ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নগুলো কক্সবাজারের চকরিয়ার কাছাকাছি। এসব উপজেলায় চিংড়ি মাছের ঘের ও অর্থকরী ফসলের চাষ বেশি হওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি।
এদিকে, টানা ছয়দিন পর খাগড়াছড়িতে সোমবার বৃষ্টি ছিল না এবং রোদ ওঠে। এই জেলার বিভিন্ন স্থানের বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে।
এই জেলার মহালছড়ি, মাটিরাঙাসহ যেসব স্থানে পাহাড়ধসের কারণে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত ছিল সেখানে ইতোমধ্যেই উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়েছে সেনাবাহিনী।
এছাড়া কক্সবাজারেও গত দুইদিন ধরে বৃষ্টি না থাকার কারণে বন্যার পানি সোমবার থেকে কমতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
তবে মাতামুহুরী উপজেলা, ঢেমুশিয়া, চকরিয়ার লক্ষারচর ও পেকুয়া উপজেলার কোন কোন স্থানে এখনো বন্যার পানি জমে আছে।
কক্সবাজারের মাতামুহুরী উপজেলার বাসিন্দা আলফাজ মামুন জানান, রোববার থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তবে এখনো পানিবন্দি রয়েছে মানুষ।
মি. মামুন জানান, "পানি একটু একটু কমতে শুরু করছে। বদারখালি এক নম্বর ওয়ার্ডে এখনও পানিবন্দি আছে মানুষ। প্রায় সাতশো থেকে আটশো মানুষ এখনো পানিবন্দি আছে।"
চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন স্থানেও এখনো পানিবন্দি রয়েছেন মানুষ। কারো ঘরবাড়িও ভেঙে গেছে।
এই জেলার বাঁশখালী উপজেলার বোলছড়ি ইউনিয়নের নয় নং ওয়ার্ডের রাজিয়া খাতুন জানান, বাড়িঘর মেরামতের জন্য সাহায্যের প্রয়োজন।
"খাইদ্য, রান্না কইরা খাইতে পাচ্ছি না। সাত-আট দিন ধরে পারছি না" বলেন মিজ খাতুন।
''৩৮ বছরে এলাকায় বন্যার এমন পানি দেখি নাই,'' তিনি বলেন।
বন্যার যে পূর্বাভাস
এদিকে, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরী ইত্যাদি নদীর পানি সমতল হ্রাস পেতে পারে।
একইসঙ্গে, নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকতে পারে।
তবে, দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যার আভাস দিয়েছে এই কেন্দ্র।
সোমবারের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তরাঞ্চলীয় রংপুর বিভাগের তিস্তা নদীর পানি সমতলে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা ও দুধকুমার নদীসমূহের পানি সমতলে বৃদ্ধি পেয়ে কিছু কিছু স্থানে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
এছাড়াও এই সময়ে গাইবান্ধা জেলায় তিস্তা নদী ও কুড়িগ্রাম জেলায় ধরলা নদী সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র।
গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামী দুইদিনে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় সুরমা-কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
এদিকে, সোমবার দুপুর এগারোটা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায়ও ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে বলে সোমবার এই সতর্কবার্তা দিয়েছে অধিদপ্তর।
এতে বলা হয়েছে, ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে ঢাকা মহানগরীর কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে বলেও জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
যদিও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে রোববারের বৃষ্টিপাতের পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। এরইমধ্যে সোমবারও সকাল থেকেই ঢাকায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে।