ঋণ করে বা ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কোরবানি নিয়ে ধর্মীয় বিধানে কী বলা আছে?

    • Author, মুকিমুল আহসান
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ঈদ-উল-আযহা বা কোরবানির ঈদ বাংলাদেশের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছর কোরবানির ঈদে সৃষ্টিকর্তার সন্তষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে পশু কোরবানি করে থাকেন মুসলিম বিশ্বসহ বাংলাদেশের মুসলমানরা।

প্রতিবছর ঈদুল আজহার দিন থেকে পরবর্তী তিনদিন পর্যন্ত অর্থাৎ ১২ই জিলহজ পর্যন্ত বিভিন্ন পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন মুসলমানরা।

সম্পদশালী ব্যক্তিদের কারো কারো একাধিক পশু কোরবানি দিতেও দেখা যায়। আবার মধ্যবিত্ত অনেকে ভাগে উট, গরু বা মহিষের মতো পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন।

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, ঈদুল আযহায় পশু কোরবানি সামার্থ্যবান নর-নারীর ওপর ওয়াজিব। কিন্তু অনেকেই জানেন না, ঠিক কত টাকা হলে একজন মুসলমানের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।

অর্থাৎ, যার কাছে কোরবানির দিনগুলোতে তার মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর নির্দিষ্ট পরিমাণ বা নিসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট থাকে তাহলে তাকে কোরবানি দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "যে সম্পদ থাকলে যাকাত ওয়াজিব হয়, সেই ধরনের সম্পদ যদি তার থাকে তাহলে তো তার কোরবানি ওয়াজিব হবে"।

অনেকের মাঝে প্রশ্ন আছে, যদি কারও কোরবানি করার সামর্থ্য না থাকে অথবা তিনি ঋণগ্রস্ত থাকেন তার ক্ষেত্রে কোরবানি দেওয়ার বিধান কী?

ইসলামি গবেষকরা বলছেন, কেউ যদি ঋণের বোঝায় জর্জরিত থাকেন, সেক্ষেত্রে ঋণ করে কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে ইসলামে।

কোরবানি ওয়াজিব যাদের জন্য

ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও আত্নিক ইবাদত। আরবি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ কোরবানির দিন ও পরবর্তী দুই দিন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা কোরবানি দিয়ে থাকেন।

ধর্মীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, যাদের ওপর কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব তারা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোরবানি না দেন তাহলে গোনাহের ভাগীদার হতে হবে।

অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বলছিলেন, "যে ব্যক্তির নেসাব পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তাকে অবশ্যই কোরবানি দিতে হবে। আর যদি না দেন তাহলে তিনি ওয়াজিব ভাঙল"।

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, নেসাব অর্থাৎ কোন ব্যক্তির কাছে সাড়ে সাত ভরি পরিমাণ স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ ভরি পরিমাণ রুপা বা এর সমমূল্যের নগদ টাকা অথবা সম্পদ থাকলে তার জন্য কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব।

হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, যেই ব্যক্তির সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু সে যদি পশু কোরবানি না করে তাকে ঈদগাহের কাছে না যেতে বলা হয়েছে।

অধ্যাপক রশীদ বলছিলেন, যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব তাদের অবশ্যই কুরবানি দিতে হবে। যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব, তারা যদি তা পালন না করেন, তবে তারা ওয়াজিব তরক করার গোনাহর ভাগীদার হবেন।

অন্যদিকে, ইসলামের বিধান অনুযায়ী যাদের সেই পরিমাণ সম্পদ বা সম্পত্তি নেই তাদের জন্য পশু কোরবানি বাধ্যতামূলক নয়।

ঋণ করে বা ঋণগ্রস্তের জন্য কী নিয়ম?

বাংলাদেশে প্রতি বছর কোরবানিতে ৯০ লাখ থেকে এক কোটি গরু কোরবানি হয়ে থাকে। যার মধ্যে বেশিরভাগই গরু এবং ছাগল কোরবানি দিয়ে থাকেন মুসলমানরা।

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, যার নেসাব বা সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকে তার জন্য কোরবানি দিতে হবে।

তবে বাংলাদেশে অনেক সময় দেখা যায় আর্থিকভাবে সামর্থ্য না থাকার পরও অনেকেই ঋণ করে কোরবানি দিতে চান।

ইসলামের গবেষকরা বলছেন, যে ব্যক্তির উপর কোরবানি ওয়াজিব, তিনিও যদি ঋণের টাকা দিয়ে কোরবানি করেন, তাহলে তার কোরবানি আদায় হয়ে যাবে।

অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ঋণগ্রস্ত হলে কোরবানি দিবে না বলেও এক ধরনের কথা প্রচলিত আছে। কিন্তু এখানে বিষয়টি হলো জীবনযাত্রা যেখানে একেবারেই চলে না, কষ্ট হয় থাকা ও খাওয়ার জন্য অর্থ নেই এরকম ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কোরবানির দরকার নাই। তাদের জন্য কোরবানি ওয়াজিব না"।

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলছিলেন, কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পূরণ হওয়ার পর, যদি কোনো ব্যক্তি তার হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ না থাকার কারণে ঋণ করে কোরবানি করেন, তবে তার এই ইবাদতটি সহিহ হবে এবং ওয়াজিব আদায় হবে"।

"তবে এই ঋণের বোঝা পরিশোধ করার সামর্থ্য তার থাকতে হবে, যাতে করে পরবর্তীতে তা তার জন্য বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়", বলছিলেন মি. রশীদ।

যে কারণে ঋণের টাকা পরিশোধের সামর্থ্য বা উৎস না থাকলে ঋণ করে কোরবানি না দেওয়ার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

বিভিন্ন সময় অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি, ব্যবসায়ী বা মানুষ তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে কোরবানির বিধান কি সেটি নিয়েও প্রশ্ন থাকে অনেকের।

এক্ষেত্রে অধ্যাপক রশীদ বলছিলেন, "মনে করেন আমার জমি আছে। কিন্তু একটা কাজের জন্য ঋণ করলাম কিন্তু তার অপজিটে আমার সম্পদ আছে, তার ক্ষেত্রে কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব। একইভাবে হজের ক্ষেত্রে সে যদি ঋণগ্রস্ত হন তার জন্য হজ ওয়াজিব"।

অর্থাৎ কোন ব্যক্তির ঋণের অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা থাকলে তিনি যদি ব্যাংকের কাছে ঋণগ্রস্ত থাকেন তাহলে তার জন্য কোরবানি দেওয়া ইসলামের বিধান অনুযায়ী বাধ্যতামূলক।

ইসলামি গবেষকদের মতে, শরিয়ত অনুযায়ী সুদভিত্তিক যেকোনো লেনদেন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ, আর কোরবানি একটি বিশুদ্ধ ইবাদত, যা সুদের মতো অপবিত্র অর্থ দ্বারা সম্পন্ন করা যায় না।

কোরবানির ক্ষেত্রে যে নিয়ম জানা জরুরি

বাংলাদেশে প্রতিবছর ঈদুল আযহায় যে পরিমাণ গবাদিপশু কোরবানি বা জবাই করা হয় তার মধ্যে বেশিরভাগই গরু ও ছাগল কোরবানি হয়ে থাকে।

এর বাইরেও বর্তমানে বাংলাদেশে মহিষ, ভেড়া, দুম্বা উটও কোরবানি হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকের পক্ষেই একা একটি গরু কোরবানি দেওয়া সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে ভাগে কোরবানি দিয়ে থাকেন।

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ সাত জন শরিক হতে পারেন। তবে ছাগল, ভেড়া বা দুম্বায় একাধিক শরিক হওয়া জায়েজ নয়, এটি একজনের নামেই হতে হবে।

ইসলামি গবেষকরা বলছেন, ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে অন্তত দুই বছর, উটের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর এবং ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে অন্তত এক বছর পূর্ণ হতে হবে। তবে ভেড়া বা দুম্বা যদি ছয় মাসের হয় কিন্তু দেখতে এক বছরের মতো বড় লাগে, তবে তা দিয়ে কোরবানি জায়েজ।

অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বলছিলেন, "আমাদের দেশে অনেক সময় কোরবানি লোক দেখানো বিষয় হয়। নিয়ম অনুযায়ী একজনের জন্য একটা বকরি বা ছাগল যথেষ্ট। একটা গরুর সাত ভাগের এক ভাগ যথেষ্ট। কিন্তু দেখা যায় কেউ কেউ ২০টা গরুও কোরবানি দিচ্ছে"।

"যদি কেউ গরীব লোককে দেওয়ার জন্য অনেক প্রয়োজনের অতিরিক্ত পশু কোরবানি দিয়ে সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেটি যেন লোক দেখানো না হয়", যোগ করেন তিনি।

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, কোরবানি ব্যক্তিভিত্তিক ইবাদত। পরিবারের একাধিক সদস্য (যেমন বাবা, মা, ছেলে) যদি প্রত্যেকে পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে প্রত্যেকের ওপর আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব হবে।

অনেকে আবার প্রশ্ন করে থাকেন কোরবানির জন্য সমপরিমাণ টাকা কী দান করা যাবে কী -না ।

এর জবাবে ইসলামি গবেষক ও লেখকরা বলছেন, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নামে পশু রক্ত প্রবাহিত করা। পশুর বদলে টাকা দান করলে ওয়াজিব কোরবানি আদায় হবে না। তবে নফল হিসেবে দান করা যেতে পারে।