যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদে তিনজনকে হত্যার পর দুই কিশোরের আত্মহত্যা

সান ডিয়েগোতে বাংলাদেশ সময় গতকাল ১৮ই মে গোলাগুলির ঘটনার পর ইসলামিক সেন্টার থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সান ডিয়েগোতে বাংলাদেশ সময় গতকাল ১৮ই মে গোলাগুলির ঘটনার পর মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা
    • Author, সারীন হাবেশিয়ান, ক্যালিফোর্নিয়া
    • Role, বিবিসি
    • Author, ম্যাক্স ম্যাটজা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৪ মিনিট

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো শহরের একটি মসজিদে বন্দুক হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। কর্মকর্তাদের ধারণা, দুই কিশোর এই হামলা চালিয়েছে।

সোমবার সকালে হামলার ঘটনাটি ঘটে। এর আগে পুলিশ এমন এক কিশোরকে খুঁজছিল, যে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল এবং তাকে আত্মহত্যাপ্রবণ বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল।

পরে পুলিশ ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগোতে গুলির খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে ভবনের সামনে তিনজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মৃত পাওয়া যায়।

এর কিছুক্ষণ পর কাছাকাছি আরেক এলাকায় গাড়ি থেকে গুলি চালানোর খবর আসে।

পরে একটি গাড়ির ভেতর ১৭ ও ১৮ বছর বয়সী দুই সন্দেহভাজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কর্মকর্তাদের ধারণা, তারা নিজেরাই নিজেদের গুলি করে আত্মহত্যা করেছে।

নিহতদের মধ্যে মসজিদের একজন নিরাপত্তাকর্মীও ছিলেন। কর্মকর্তাদের দাবি, তিনি সাহসিকতার সঙ্গে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন।

সান ডিয়েগো পুলিশের প্রধান স্কট ওয়াহ্ল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, "তার কাজ বীরত্বপূর্ণ। আজ তিনি নিঃসন্দেহেই অনেকের জীবন বাঁচিয়েছেন।"

কর্তৃপক্ষ এখনো নিহত তিনজনের নাম প্রকাশ করেনি।

তবে নিহত ওই নিরাপত্তাকর্মীকে চিনতেন এমন একজন বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএসকে জানিয়েছেন, তিনি আট সন্তানের বাবা ছিলেন।

সান ডিয়েগোর মসজিদ প্রাঙ্গণে পুলিশের একাধিক গাড়ি
ছবির ক্যাপশান, সান ডিয়েগোর মসজিদ প্রাঙ্গণে পুলিশের একাধিক গাড়ি
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, হামলার উদ্দেশ্য এখনো অজানা। তবে সান ডিয়েগো কাউন্টির সবচেয়ে বড় মসজিদকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং সন্দেহভাজনদের একজনের লিখে রেখে যাওয়া নোটের কারণে ঘটনাটিকে ঘৃণাজনিত অপরাধ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সান ডিয়েগো পুলিশের প্রধান স্কট ওয়াহল জানান, স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৪৩ মিনিটে পুলিশ প্রথম মসজিদে পৌঁছে ভবনের সামনে তিনজনের মরদেহ দেখতে পায়।

তিনি বলেন, "পুলিশ কোনো গুলি চালায়নি" এবং ঘটনাস্থলে কোনো হামলাকারীকেও পাওয়া যায়নি।

হামলার প্রায় দুই ঘণ্টা আগে সন্দেহভাজনদের একজনের মা পুলিশকে জানান, তার ছেলে বাড়ি থেকে তার (মায়ের) কয়েকটি অস্ত্র ও গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেছে।

তিনি আরও জানান, তার ছেলের সাথে আরও একজন ছিল এবং দু'জনই সামরিক পোশাকের মতো ক্যামোফ্লাজ পোশাক পরেছিল।

পুলিশ প্রধান বলেন, তাদের কাছে ওই কিশোরের আচরণ আত্মহত্যাপ্রবণ বলে মনে হয়নি। বরং, তার রেখে যাওয়া নোটে "সাধারণ ঘৃণামূলক বক্তব্য ও বিদ্বেষপূর্ণ ভাষা" পাওয়া গেছে।

তবে ওই নোটে মসজিদ বা নির্দিষ্ট কোনো স্থান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে হুমকি ছিল না, তিনি জানান।

মসজিদের কাছেই মাথায় স্কার্ফ পরা একজন নারী পুলিশের সাথে কথা বলছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ঘটনার পর তদন্তকারীরা একটি স্থানীয় স্কুলে যান, কারণ ওই কিশোরদের একজন সেখানকার শিক্ষার্থী ছিল।

এরপর পুলিশ একটি শপিং মলেও যায়, যেখানে সন্দেহভাজনদের গাড়ি দেখা গিয়েছিল।

গোলাগুলির ঘটনা ঘটার সময়ও পুলিশ কর্মকর্তারা সন্দেহভাজন কিশোরের মায়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তখন তারা মসজিদ থেকে মাত্র কয়েক ব্লক দূরে ছিলেন।

ভবনের বাইরে তিনজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ভেতরে ঢোকে এবং এই ধরনের পরিস্থিতিতে যেসব নিরাপত্তা প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, সেগুলো শুরু করে।

তারা যখন মসজিদের কক্ষগুলো তল্লাশি করছিল, তখন কাছাকাছি এলাকায় আরেকটি গুলির ঘটনার খবর আসে।

স্কট ওয়াহল বলেন, সন্দেহভাজনরা গাড়ি থেকে একজন ল্যান্ডস্কেপ কর্মীর দিকেও গুলি চালায়। তবে তিনি আহত হননি। ধারণা করা হচ্ছে, তার নিরাপত্তা হেলমেটে গুলি লেগে বেরিয়ে যায়।

ল্যান্ডস্কেপার বলতে সাধারণত এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি বাগান, ঘাস, গাছপালা বা বাইরের পরিবেশ সাজানো ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করেন।

কান্না করছেন এক নারী

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, ১৮ই মে মসজিদে বন্দুক হামলার পর কাঁদছেন সান ডিয়েগোর মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা।

পরে মসজিদ থেকে কয়েক ব্লক দূরের ওই দ্বিতীয় ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ এবং গিয়ে দুই সন্দেহভাজনের মরদেহ উদ্ধার করে।

ঘটনার সময় মসজিদ প্রাঙ্গণে শিশুরাও উপস্থিত ছিল। কারণ ইসলামিক সেন্টারের ভেতরে আল রশিদ স্কুল নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে ধর্মীয় ও ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়।

ওপর থেকে করা ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশি অভিযানের সময় শিশুদের হাত ধরে কেন্দ্রটির পার্কিং এলাকা দিয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

আশপাশের স্কুলগুলোও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

তদন্তে সহায়তার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে তথ্য চেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা এফবিআই।

বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএসকে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি আধা-স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের শব্দ শুনেছেন, যেখান থেকে প্রায় ৩০টি গুলির আওয়াজ পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, প্রথমে প্রায় এক ডজন গুলির শব্দ শোনেন, এরপর কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবারও একই ধরনের শব্দ হয়।

অবসরপ্রাপ্ত একজন দুপুরে বাড়িতে খাচ্ছিলেন। ঘটনার সময় তিনি ৯১১ নম্বরে ফোন করেন। তিনি বলেন, কল করার পাঁচ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যেই পুলিশ পৌঁছে যায়।

ছুটির দিনগুলোতে মসজিদটিতে অনেক মানুষের সমাগম হয়, বলছিলেন তিনি।

"এটি ভালো যে ঘটনাটি শুক্রবারে ঘটেনি। শুক্রবার হলে রাস্তাজুড়ে মানুষ থাকতো।"

বিস্মিত এক নারী

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, বন্দুক হামলার পর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন রেমা আবেদকাদের

সান ডিয়েগো ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক তাহা হাসান বলেন, "উপাসনালয়কে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত নিন্দনীয়।"

"এটি একটি উপাসনালয়, যুদ্ধক্ষেত্র নয়," যোগ করেন তিনি।

মুসলিম সম্প্রদায় বর্তমানে তাদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহা'র প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গাভিন নিউসম এক বিবৃতিতে জানান, ইসলামিক সেন্টারে আজকের এই "সহিংস হামলায় আতঙ্কিত" তিনি। তার ভাষায়, "এটি এমন একটি স্থান, যেখানে পরিবার ও শিশুরা জড়ো হয় এবং মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে উপাসনা করে।"

নিউসম আরও বলেন, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা বা ভয়ভীতি সৃষ্টির কোনো ঘটনা ক্যালিফোর্নিয়া সরকার বরদাশত করবে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সোমবারের গোলাগুলির ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এই ঘটনাকে "ভয়াবহ পরিস্থিতি" বলে মন্তব্য করেছেন।

হোয়াইট হাউজের এক ভিন্ন অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, "ঘটনাটি সম্পর্কে আমাকে প্রাথমিক কিছু তথ্য জানানো হয়েছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখবো।"