তরবারির জোরে নয়, আরব বণিকদের মাধ্যমে যেভাবে ভারতে এসেছিল ইসলাম

ছবিতে ফুটে উঠেছে বাণিজ্যের জন্য আরবদের সমুদ্রযাত্রা
ছবির ক্যাপশান, ছবিতে ফুটে উঠেছে বাণিজ্যের জন্য আরবদের সমুদ্রযাত্রা
    • Author, মির্জা এবি বেগ
    • Role, বিবিসি সংবাদদাতা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী ভারতে ইসলামের আগমন ঘটেছিল ৭১২ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া শাসনামলে যখন মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধ আক্রমণ করেছিলেন, অর্থাৎ তরবারির শক্তির ওপর ভর করেই ভারতে ইসলামের আগমন হয়েছিল। তবে অনেক পণ্ডিত এই ধারণার সঙ্গে সহমত নন।

ইতিহাসবিদদের অনেকেই মনে করেন ইসলামের আগমন কোনো একক ঘটনার ফল নয়; বরং এটা কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রক্রিয়ার পরিণাম।

ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন এবং তার সমর্থনে বিভিন্ন তত্ত্বও পেশ করেন।

এরই মধ্যে অন্যতম মতবাদ হলো, ভারতে ইসলামের প্রচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বাণিজ্য।

প্রাচীনকাল থেকেই ভারত মশলার জন্য সারা বিশ্বে পরিচিত। মশলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল গোল মরিচ বা কালো মরিচের। আরব দেশ থেকে শুরু করে গ্রীক ও রোমান সাম্রাজ্য পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতীয় গোল মরিচের সুনাম।

গোল মরিচের ব্যবসা সম্পর্কে বিশদে বোঝার জন্য আমরা কেরালার কোচি শহর হয়ে কোদুঙ্গাল্লুরে পৌঁছেছিলাম।

স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, এক সময় এখানেই ছিল প্রাচীন মুজিরিস বন্দর। পনেরশো শতাব্দীর বিধ্বংসী বন্যায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায় এই বন্দর।

একজনের হাতের তালুতে অনেকগুলো গোল মরিচ
ছবির ক্যাপশান, গোলমরিচের ব্যবসার সঙ্গে ভারতে ইসলামের আবির্ভাবের যোগ রয়েছে বলে মনে করা হয় - প্রতীকী ছবি

আরব বণিকদের সমুদ্রযাত্রা

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

কেরালা যাওয়ার আগে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এবং মধ্যযুগীয় ইতিহাসের শীর্ষস্থানীয় ইতিহাসবিদ সৈয়দ জাহির হুসেইন জাফরির সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলেছিলাম।

তার মতে, আরব সাগর ছিল বঙ্গোপসাগরের তুলনায় শান্ত। ইতিহাসবিদ জাফরির মতে, এই সাগরে যদি একটা খড় বা কাঠের টুকরোও ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলেও সেটা আরব ও ওমান উপকূলে পৌঁছাতে পারত।

দীর্ঘদিন ধরে এই সমুদ্রপথে আরবদের প্রভাব ছিল। তারা ভারতে আসতেন বর্ষার সময়ে। এখানে কিছুদিন কাটিয়ে বর্ষা শেষে আরবে ফিরে যেতেন।

অধ্যাপক জাফরির মতে, এই সমুদ্রপথ দিয়েই শ্রীলঙ্কা, জাভা, সুমাত্রা, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছিল আরবরা।

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সৈয়দ সুলেমান নদভী তার বই 'আরব ওয়াহ হিন্দ কে তাল্লুকাৎ', বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় আরব ও ভারতের সম্পর্ক, সেখানে লিখেছিলেন, "ইউরোপ ও ভারতের মধ্যে সমুদ্রপথ ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একসময়ে এটা সম্পূর্ণভাবে আরবদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৩০০ বছর আগে যখন গ্রীকরা মিশর জয় করে, সেই সময়ে তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এই সমুদ্রপথ।"

তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, "যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৬০০ বছর পর, যখন ইসলামের আবির্ভাব ঘটে এবং আরবদের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে, সেই সময়ে, ষষ্ঠ শতাব্দীতে, মিশর থেকে স্পেন পর্যন্ত তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। একইসঙ্গে তারা ভূমধ্যসাগরের নিয়ন্ত্রণও নেয়। ফলে, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ আরবদের হাতে চলে যায়, আর পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকে এই বাণিজ্য পথটি।"

অধ্যাপক জাফরির মতে, ভারতে থাকাকালীন অনেক আরব ব্যবসায়ী স্থানীয় নারীদের বিয়েও করেছিলেন। আরব ও ভারতের মধ্যে এই দীর্ঘ যোগাযোগের ফলে দক্ষিণ ভারতে 'মাপ্পিলা মুসলিম' নামে এক মুসলিম সম্প্রদায়ের বিকাশ ঘটে।

অধ্যাপক সৈয়দ জাহির হুসেইন জাফরি
ছবির ক্যাপশান, অধ্যাপক জাফরি ​​বলছেন, দক্ষিণ ভারতে ইসলামের আগমন সম্পর্কিত মৌখিক দাবিগুলো এতটাই শক্তিশালী যে প্রমাণের অভাবেও সেগুলোকে খারিজ করা যায় না

ঐতিহাসিক প্রমাণের অভাব

দক্ষিণ ভারতে মুসলমানরা ঠিক কোন সময়ে এসেছিলেন, তা সঠিকভাবে অনুমান করা কঠিন, কারণ এর সমর্থনে খুব কমই ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে।

আরবের নাবিকরা তাদের সফরের বিষয়ে কোনো লিখিত নথি রেখে যাননি। তারা যে সমস্ত ভবন তৈরি করেছিলেন সেখানে খোদাই করা কোনো শিলালিপি নেই। তবে যদি কোনো শিলালিপি থেকেও থাকে, ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজদের আগমন এবং মুসলমানদের সঙ্গে তাদের সংঘাতের সময়ে সেসবের বড় অংশই সম্ভবত ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিলো।

রাজনীতিবিদ ও লেখক শশী থারুর প্রায়শই উল্লেখ করে থাকেন যে, ইসলামের আগমনের কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই আরবের বণিক এবং নাবিকরা মালাবার উপকূলে যাতায়াত করতেন।

তার মতে, ভারতে যে সময় ইসলামের আবির্ভাব হয়েছিল, তখন তা তলোয়ারের জোরে কেরালায় পৌঁছায়নি, বরং পরিচিত ও বিশ্বস্ত আরব বণিকদের হাত ধরে ওই অঞ্চলে ইসলাম এসেছিলো, যারা ইতোমধ্যে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ছিলেন।

পাশাপাশি কেরালার হিন্দু রাজা চেরামন পেরুমলের ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার গল্পও এই বিষয়ে প্রচলিত ধারণার অংশ।

আমরা খুব ভোরে কেরালার ফোর্ট কোচি থেকে কোচি হেরিটেজ প্রজেক্টের প্রতিষ্ঠাতা ইয়োহান বেন্নি কুরুভিলা এবং আমাদের চিত্রগ্রাহক বিমল থাঙ্কাচানের সঙ্গে কোদুঙ্গাল্লুরের পেরিয়ার নদীর তীরে পৌঁছাই।

সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন কোট্টায়ামের মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্ডিয়া-আরব কালচার সেন্টারের সাবেক পরিচালক এমএইচ ইলিয়াস।

কেরালার উপকূল অঞ্চলের ছবি- ফাইল ছবি
ছবির ক্যাপশান, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো, দক্ষিণ ভারতের উপকূলীয় অঞ্চল কেরালাতেও ইসলামের আগমন ঘটেছিল - ফাইল ছবি

দক্ষিণ ভারতে ইসলাম

প্রফেসর ইলিয়াসের মতে, দক্ষিণ ভারতে ইসলামের আগমন সম্পর্কে চারটি প্রধান তত্ত্ব রয়েছে।

প্রথম তত্ত্ব অনুযায়ী, ইসলামের নবীর জীবদ্দশাতেই ইসলাম প্রাচীন মুজিরিস বন্দর দিয়ে ভারতে পৌঁছেছিল।

এই দাবির সমর্থনে চেরামন জামা মসজিদের কথা উল্লেখ করা হয়। এটা ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে মালিক বিন দিনারের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়। মসজিদের শিলালিপিতেও এর উল্লেখ রয়েছে।

তবে ইতিহাসবিদদের অনেকেই নির্দিষ্টভাবে তারিখ সম্পর্কে মতামত দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এর কারণ কোথাও মালিক ইবনে দিনারকে 'সাহাবী' হিসেবে গণ্য করা হয়, কোথাও আবার তাকে 'তাবাঈনে'র অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সাহাবী বলতে তাদেরই বোঝায় যারা ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামের নবীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন, আর তাবাঈন হলেন তারা, যারা ইসলাম গ্রহণের পর সাহাবীদের সান্নিধ্য পেয়েছেন।

এই মসজিদ প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে। কোদুঙ্গাল্লুরের হিন্দু রাজা চেরামন পেরুমলকে আরব বণিকরা জানিয়েছিলেন যে, আরবে একজন নবীর আবির্ভাব ঘটেছে। এরপর রাজা আরবের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি সেখানে নবীর সাক্ষাৎ পান এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।

দ্বিতীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, ভারতে ফেরার সময় ওমানের সালালাহ শহরে তার মৃত্যু হয়েছিল। সেখানে তাকে কবর দেওয়া হয় বলেও দাবি করা হয়।

আলেকজান্ডার হেনরি হ্যালাম মারের আঁকা খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির সমাধি
ছবির ক্যাপশান, আলেকজান্ডার হেনরি হ্যালাম মারের আঁকা খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির সমাধি

অন্যান্য তত্ত্ব

প্রফেসর ইলিয়াসের মতে, দ্বিতীয় তত্ত্ব অনুসারে, ইসলামের নবী মোহাম্মদের সঙ্গে চেরামন পেরুমলের দেখা হয়নি এবং ওমানে তার মৃত্যু হয়।

তবে দুই তত্ত্বেই এটা উল্লেখ করা হয়েছে যে, মালিক বিন দিনারের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিলো। তিনি তার উত্তরসূরিকে একটা চিঠিও পাঠান যেখানে মালিক ইবনে দিনার ও তার সঙ্গীদের প্রতি সম্মান দেখানো এবং তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করার কথা উল্লেখ করা ছিল।

মালিক বিন দিনার যখন মুজিরিস বন্দর তথা অধুনা কোদুঙ্গাল্লুরে এসে পৌঁছান, তখন রাজার উত্তরসূরি তাকে স্বাগত জানান। এছাড়া মসজিদ নির্মাণের জন্য প্রাসাদের কাছে জমিও দেওয়া হয়। এই মসজিদ আজও বিদ্যমান।

প্রফেসর ইলিয়াসের কথায়, "আরবরা এখানে মূলত মশলা, বিশেষত গোল মরিচের ব্যবসা করতে এসেছিল। তবে শুধু ইসলামই নয়, তারা সঙ্গে করে অন্যান্য কিছুও এনেছিলেন।"

"উদাহরণস্বরূপ, হিসাব করার এবং ওজন মাপার বিভিন্ন পদ্ধতি, যা আজও ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া ভালো নৌকা ও জাহাজ নির্মাণের কৌশলও শিখিয়েছিলেন তারা।"

চেরামন জামা মসজিদ
ছবির ক্যাপশান, স্থানীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত চেরামন জামা মসজিদ

চেরামন জামা মসজিদ

গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার মাঝেই আমরা পৌঁছেছিলাম সেই ঐতিহাসিক মসজিদে। তখন দুপুরের নামাজের সময়।

মসজিদের ইমাম সেলিম নদভির সঙ্গে দেখা করি আমরা। তিনি লক্ষ্ণৌয়ের ইসলামিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নাদওয়াতুল উলেমা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।

তিনি জানিয়েছেন, মসজিদ সংলগ্ন বারান্দায় মালিক ইবনে দিনারের ছেলে ইউসুফ বিন দিনার ও তার স্ত্রীর কবর রয়েছে। মালিক ইবনে দিনার এবং তার সঙ্গীরা সেই সময় এই অঞ্চলে প্রায় দশটা মসজিদ ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

মালিক বিন দিনারের সমাধি এখান থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার উত্তরে আরব সাগরের উপকূলে কাসারগোডে অবস্থিত বলে জানা যায়।

প্রফেসর ইলিয়াসের মতে, বিভিন্ন তত্ত্ব থাকা সত্ত্বেও সবাই এই বিষয়ে একমত যে রাজা চেরামানের হাত ধরেই ভারতে ইসলামের বিস্তার হয়েছিল।

সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের সামুদ্রিক বাণিজ্য পথে আরব বণিকদের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল। তারা সঙ্গে করে শুধু পণ্যই আনেনি, নিজেদের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যও বয়ে এনেছিলেন।

কেরালা ও গুজরাতের উপকূলীয় অঞ্চলে স্থানীয় শাসকরা এই ব্যবসায়ীদের স্বাগত জানান। মসজিদ নির্মাণ ও বসতি স্থাপনের অনুমতিও দেওয়া হয় তাদের।

চেরামান মসজিদের ভেতরে ঝুলন্ত প্রদীপ। মসজিদে চার জন নামাজ পড়ছেন
ছবির ক্যাপশান, চেরামান মসজিদ থেকে ঝুলন্ত প্রদীপ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে রয়েছে, যে প্রদীপ স্থানীয়রা ওই মসজিদকে দান করেন

যুদ্ধে জয়ের মাধ্যমে ইসলামের আবির্ভাব

এই বিষয়ে একটা তত্ত্ব বলছে, আরবদের 'যুদ্ধজয় এবং রাজনৈতিক সম্প্রসারণ'-এর সঙ্গেও ভারতে ইসলামের প্রচলনের সম্পর্ক রয়েছে।

সেই তত্ত্ব অনুযায়ী, ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রথম বড় রাজনৈতিক অগ্রগতি ঘটেছিল ৭১২ খ্রিস্টাব্দে, যে সময়ে মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে আরব সেনাবাহিনী সিন্ধ এবং মুলতান দখল করে।

পরবর্তীকালে গজনী ও ঘোরী শাসকদের আক্রমণের হাত ধরে দিল্লির সালতানাতের ভিত্তি স্থাপন হয়।

প্রাচীন ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ একে "তলোয়ারের দ্বারা ইসলামের আগমন" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আধুনিক গবেষকদের মতে, এই জয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা, জোর করে মানুষকে ধর্মান্তরিত করা নয়।

আধুনিক গবেষকদের মতে ধর্মান্তরণ প্রক্রিয়ার বেশিরভাগই ধীরে ধীরে ঘটেছিল এবং তার পেছনে ছিল সামাজিক কারণ।

আজমেরের দরগাহের ছবি
ছবির ক্যাপশান, ইসলামের প্রসারে সুফিদের প্রভাব উল্লেখযোগ্য বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা

সুফিদের প্রভাব

অধ্যাপক সৈয়দ জাহির হুসেইন জাফরি বলেন, 'দ্য গ্রেভস অব তারিম' বইটি প্রকাশের পর জানা যায়, ইয়েমেন ও হাদ্রামাউত, বা আরবের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ যেখানেই পৌঁছেছেন সেখানেই মসজিদ, সমাধি ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইসলামের বিস্তারের আগে থেকেই এই কেন্দ্রগুলো শান্তিপূর্ণ, ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে বিদ্যমান ছিল যেখান থেকে ধর্মীয় প্রচার করা হতো।

এই বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে সুফি-সন্তদের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। এখান থেকে শুধু বাণিজ্যই নয়, আধ্যাত্মিক বিষয়েও প্রচার হতো যা ক্রমে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় গিয়ে পৌঁছায়।

‌একাদশ শতকের পরে, চিশতি, সোহরাওয়ার্দী এবং অন্যান্য সুফি-সন্তরা ভারতের বিভিন্ন অংশে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সুফি খানকাহ ও দরগাহগুলো আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেব আবির্ভূত হয় যেখানে সব ধর্মের লোকেরা পরিদর্শন করতেন।

আজমেরের খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির দরগাহ এর একটা প্রধান উদাহরণ, যেখানে হিন্দু এবং মুসলমান দুই ধর্মের মানুষই সমান শ্রদ্ধার সঙ্গে যান। এইভাবে ভারতে ইসলামের প্রসারে সুফি আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

অধ্যাপক জাফরির মতে, ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ন্যায়বিচারের নীতিগুলো সামাজিক স্বীকৃতি এবং সম্মান অর্জনের সুযোগ এনে দিয়েছিল।

তবে আধুনিক গবেষকরা এই তত্ত্বের কিছু সীমাবদ্ধতার বিষয়েও উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে সেই সমস্ত অংশে ইসলাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল, যেখানে বর্ণ প্রথা দেশের অন্যান্য অংশের মতো প্রবল ছিল না।

এই জলাশয় রাজা চেরামান মসজিদকে দান করেছিলেন
ছবির ক্যাপশান, এই জলাশয় রাজা চেরামান মসজিদকে দান করেছিলেন

কৃষি ও রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ

এই প্রসঙ্গে একটা তুলনামূলকভাবে নতুন তত্ত্ব হলো 'কৃষি সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ', যা উল্লেখ করেছেন ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটনের মতো পণ্ডিতরা।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী বাংলা ও পাঞ্জাবের মতো অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার মূলত কৃষি উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী শাসকরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সুফি খানকাহ ও মসজিদগুলিকে অনুর্বর বা ফাঁকা জমি প্রদান করেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কৃষি বসতি স্থাপন করে। এই অঞ্চলে বসবাসকারী কৃষকরা ধীরে ধীরে ইসলাম গ্রহণ করেন কারণ তারা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটা অংশ হয়ে উঠেছিলেন।

এই সমস্ত তত্ত্ব থেকে এটা স্পষ্ট যে, ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের বিস্তার কোনো একটা কারণে ঘটেনি। বরং, একাধিক ঐতিহাসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণের সংমিশ্রণের ফলে এর বিস্তার ঘটে।

বাণিজ্য, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, রাজনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সবই একত্রিত হয়ে একটা দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিলো, যা এই অঞ্চলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।