‘ভারতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন চালু হবে দিনকয়েকের মধ্যেই’

সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন পাশ হওয়ার সময়েই ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছিল দেশ জুড়ে - ফাইল ছবি
ছবির ক্যাপশান, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন পাশ হওয়ার সময়েই ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছিল দেশ জুড়ে - ফাইল ছবি
Published

ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য শান্তনু ঠাকুর-সহ একাধিক বিজেপি নেতা জানাচ্ছেন আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই চালু হয়ে যাবে দেশের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন। চার বছরেরও বেশি আগে এই বিতর্কিত আইন দেশের পার্লামেন্টে পাশ হলেও এখনও ধারা তৈরি না হওয়ায় তা চালু হয়নি।

এই আইনের ফলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে সে সব দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও খ্রিষ্টানরা যদি ধর্মীয় সহিংসতার কারণে ২০১৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বরের আগে ভারতে এসে থাকেন, তাহলে তারা ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবেন।

হিন্দুদের মতুয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও কেন্দ্রীয় জাহাজ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের পরে পশ্চিমবঙ্গ ও জাতীয় স্তরের একাধিক বিজেপি নেতা বলেছেন যে আগামী সাত থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ চালু হয়ে যাবে। এর আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও কলকাতায় এসে বলে গিয়েছিলেন যে ওই আইন চালু করে দেবে সরকার।

চার বছরেরও বেশি আগে, ২০১৯ সালে যখন আইনটি পাশ করা হয়, সে সময়ে দেশ জুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছিল। সেই প্রতিবাদে যেমন নারীরা সামনে এগিয়ে এসেছিলেন, তেমনই বিপুল সংখ্যায় যোগ দিয়েছিলেন মুসলিমরাও।

কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর (বাঁয়ে)
ছবির ক্যাপশান, কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর (বাঁয়ে)

টাইমস অফ ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে যে ইতিমধ্যেই ওই আইনের ধারাগুলি তৈরি হয়ে গেছে। এক সরকারি কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে ওই সংবাদ পত্রটি জানিয়েছে, লোকসভা ভোটের অনেক আগেই সিএএ চালু করার বিজ্ঞপ্তি জারি করতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার।

ওই কর্মকর্তা জানান, নিয়ম ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছে। অনলাইন পোর্টালও তৈরি হয়েছে। এই গোটা প্রক্রিয়া অনলাইনেই করা হবে। সেখানে আবেদনকারীদের শুধু জানাতে হবে যে কোন সালে বিনা নথিতে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন তারা। তাদের কাছ থেকে কোনও নথি চাওয়া হবে না।

কী বলছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী?

বিজেপির সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমি যে ঘোষণা করেছি জনসভায়, সেটা একেবারেই সঠিক। কয়েকদিনের মধ্যেই দেখতে পাবেন কীভাবে আইনটি চালু করে দেওয়া হবে। তবে তার আগে বিস্তারিতভাবে আমি কিছু বলছি না।"

তিনি যে মতুয়া বা পূর্ববঙ্গের নশঃশুদ্রদের একাংশের নেতা, তাদের মধ্যে বহু মানুষ সিএএ চালু কেন হচ্ছে না, এই প্রশ্ন তুলে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন। মি. ঠাকুর নিজেও একাধিকবার এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দলেরই শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে।

মতুয়া সম্প্রদায়ের একটা অংশ মনে করেন এই আইন চালু হয়ে গেলে বিরাট সংখ্যক মতুয়া, যারা ভারতে বসবাস করেন, তাদের নাগরিকত্বের দাবি মিটবে।

আবার বাঙালি উদ্বাস্তু আন্দোলনের নেতা ও লেখক সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাসের কথায়, "আমরা বারবার বলে আসছি যে সিএএ দিয়ে কেউ নাগরিকত্ব পাবে না। এই আইন কার্যকর করা হলে আবেদন হয়তো করতে পারবেন অনেক উদ্বাস্তু এবং মতুয়ারা, কিন্তু নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার আইন এটা নয়।"

Skip YouTube post, 1
Google YouTube কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: বিবিসির নয় এমন ওয়েবসাইটের কনটেন্টের জন্য বিবিসি দায়ী না YouTube কনটেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of YouTube post, 1

"এই আইনে যেসব নথি জমা দেওয়ার কথা বলা আছে, তার মধ্যে একটা হচ্ছে আবেদনকারী যে দেশ থেকে এসেছেন, সেখানে যে ধর্মীয় সহিংসতার কারণে দেশ ছাড়তে হয়েছে তার প্রমাণ লাগবে। সেই প্রমাণ কে যোগাড় করে আনবে?"

"আবার ওই আবেদনকারী যে দেশের বাসিন্দা ছিলেন, সেখানকার নাগরিকত্বেরও প্রমাণ লাগবে। অন্য দেশ থেকে এসে এখানে নানা ভাবে ভারতীয় নথি যোগাড় করে যারা আজ চাকরিবাকরি করছেন, তারা কি পুরনো দেশের নাগরিকত্বের প্রমাণ সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার সাহস করবেন?" বলছিলেন মি. বিশ্বাস।

আবার বছর পাঁচেক আগে সিএএ পাশ হওয়ার সময়ে যে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গে সেইসব প্রতিবাদের অন্যতম সংগঠক ছিলেন অধ্যাপক সামিরুল ইসলাম।

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, "যারা নতুন করে নাগরিকত্ব পাবেন বলে মনে করছেন, তাদের কি রেশন কার্ড বা ভোটার কার্ড নেই? ইতিমধ্যেই তো তাদের কাছে সেসব রয়েছে। নতুন করে কেন নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করবেন তারা?"

আসাম থেকে পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাব থেকে দিল্লি - প্রতিবাদ হয়েছিল সব জায়গাতেই - ফাইল ছবি
ছবির ক্যাপশান, আসাম থেকে পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাব থেকে দিল্লি - প্রতিবাদ হয়েছিল সব জায়গাতেই - ফাইল ছবি

ভোটের আগে কেন এই ঘোষণা?

বিশ্লেষকরা বলছেন লোকসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এরকম একটি ঘোষণা সম্পূর্ণভাবেই রাজনীতির অঙ্ক কষে নেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে অন্তত তিরিশটি বিধানসভা এলাকায় মতুয়ারাই নির্বাচনে নির্ণায়ক শক্তি। তাদের একটা বড় অংশ ২০১৯-এর নির্বাচনে বিজেপিকে সমর্থন দিয়েছিলেন বলেই রাণাঘাট ও বনগাঁ - এই দুটি লোকসভা আসনে বিজেপি জয়ী হয়েছিল।

তারা যাতে কয়েক মাস পরের লোকসভা ভোটে আবারও বিজেপির পাশেই দাঁড়ান, সেই আশাতেই শান্তনু ঠাকুর সিএএ নিয়ে এরকম একটা ঘোষণা করলেন বলে মনে করেন সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মী ও অধ্যাপক সামিরুল ইসলাম।

"সবই হচ্ছে ভোটের রাজনীতি। লোকসভা ভোট আসছে, তার ঠিক আগেই এরকম একটা ঘোষণা করা পুরোটাই রাজনীতির হিসাব কষে", বলছিলেন মি ইসলাম।

মমতা ব্যানার্জী পশ্চিমবঙ্গে এই আইন চালু হতে দেবেন না বলে ঘোষণা করেছেন - ফাইল ছবি
ছবির ক্যাপশান, মমতা ব্যানার্জী পশ্চিমবঙ্গে এই আইন চালু হতে দেবেন না বলে ঘোষণা করেছেন - ফাইল ছবি

একই কথা বলছেন সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাসও।

তার কথায়, "আইন তো পাশ হয়েছে চার বছরেরও বেশি হয়ে গেছে। এতদিন কেন রুলস তৈরি করল না? যদি সেটা করা হত, তাহলে অনেক আগেই মতুয়া আর উদ্বাস্তুরা বুঝে যেতেন যে সিএএ দিয়ে নাগরিকত্ব পাওয়া যাচ্ছে না।"

এখন আইন চালু করা হলে যতদিনে মতুয়া বা উদ্বাস্তুরা বুঝতে পারবেন যে এই আইনে নাগরিকত্ব পাওয়া যাচ্ছে না, ততদিনে ভোট পেরিয়ে যাবে," বলছিলেন মি. বিশ্বাস।

পশ্চিমবঙ্গে বাধা মমতা ব্যানার্জীর

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী প্রথম থেকেই বলে আসছেন যে এই রাজ্যে তিনি সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন কিছুতেই চালু করতে দেবেন না।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপির নেতাদের মন্তব্যের পরেও সেই একই নীতিতে অনড় থাকবে তৃণমূল কংগ্রেস, এমনটাই তারা ঘোষণা করেছে।

মমতা ব্যানার্জী নিজে বলেছেন, "নতুন করে ক্যা ক্যা করে চিৎকার করছে। এটা ভোটের রাজনীতি করবার জন্য।"

"আপনারা সবাই নাগরিক। আপনাদের সবাইকে নাগরিক হিসেবে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি। সমস্ত উদ্বাস্তু কলোনিকে স্থায়ী ঠিকানা দিয়ে দিয়েছি", মন্তব্য করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

Skip YouTube post, 2
Google YouTube কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: বিবিসির নয় এমন ওয়েবসাইটের কনটেন্টের জন্য বিবিসি দায়ী না YouTube কনটেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of YouTube post, 2

তবে বিজেপি নেতা ও রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন , "সিএএ ওনাকে করতে হবে না, ফেব্রুয়ারি মাসে শেষের দিকে সিএএ কার্যকর হয়ে যাবে।"

"আমার কাছে যেটুকু খবর আছে, তাতে কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি নাম নথিভুক্তিকরণের সুযোগ দেবে", জানিয়েছেন মি অধিকারী।

বিজেপি নেতারা এটাও বারে বারেই বলেছেন যে সিএএ চালু হয়ে গেলে যে ভারতের মুসলমানদের চিহ্নিত করে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হতে পারে বলে একটা প্রচার ছিল, তার কোনও সারবত্তা নেই।