নতুন পে-স্কেল কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, প্রভাব কেমন হবে

সরকার নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের সরকার নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা দেশটির সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল অনুমোদনের পর এটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে কিংবা বাড়তি এই বিশাল অংকের অর্থের যোগান কিভাবে নিশ্চিত করা হবে তা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা সমালোচনা শোনা যাচ্ছে।

একই সাথে পে-স্কেল নিয়ে সরকারি এই ঘোষণার পর দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়া অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের প্রভাবের আশঙ্কা করছেন অনেকে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী এই পে-স্কেল চলতি বছরের পহেলা জুলাই থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, পে-স্কেলে সরকার বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করেছে, তবে বেতন বৃদ্ধির কারণে 'কিছুটা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আছে'।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি সংকটে উৎপাদনখাতে স্থবিরতার পাশাপাশি রাজস্ব আহরণে দুর্বলতার কারণে অভ্যন্তরীণ আয় সংগ্রহে দুর্বলতার মধ্যেই সরকার চাকরিজীবীদের সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বেতন বাড়িয়ে নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে।

"এর ফলে সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি কাটছাঁট করতে হতে পারে। পাশাপাশি চাপের মুখে পড়বে বেসরকারি খাতের মানুষ," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অর্থনীতিবিদ ডঃ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি অবশ্য বলেছেন, প্রতি পাঁচ বছরে পে স্কেল হওয়ার কথা কিন্তু গত ১২ বছরে তা হয়নি। এসব দিক বিবেচনা করে যতটা ব্যালেন্সড করা যায় এই বেতন কাঠামোতে তাই করা হয়েছে।

নবম পে-স্কেলের মূল বেতনের ৩০ শতাংশ এই বছরের পহেলা জুলাই থেকে কার্যকর হবে
ছবির ক্যাপশান, নবম পে-স্কেলের মূল বেতনের ৩০ শতাংশ এই বছরের পহেলা জুলাই থেকে কার্যকর হবে

কত অর্থ লাগবে, কোথা থেকে আসবে

বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং প্রায় নয় লাখ পেনশনভোগী রয়েছে। চলতি অর্থ বছরের বাজেটে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে।

পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ ব্যয় ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত জুনে জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় পহেলা জুলাই থেকেই ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

ওদিকে বেতন কমিশনের সুপারিশ ও সরকারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নবম পে-স্কেল বা নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ৪৪ হাজার কোটি টাকা চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে ও বিভিন্ন সংস্থার সাথে আলোচনা করেছে।

পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎস অর্থ রাজস্ব আয় বাড়িয়ে কিভাবে এই অর্থের সংস্থান করা যায় সেই চেষ্টাও চলছে বলে কর্মকর্তারা ধারণা দিয়েছেন।

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ সরকারি কর্মচারীদের বিদ্যমান ২০টি বেতন গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে
ছবির ক্যাপশান, জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ সরকারি কর্মচারীদের বিদ্যমান ২০টি বেতন গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, বাজেটের ওপর চাপ কমানো, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ সামলিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য আনতে সরকার এই নবম পে-স্কেল দুই বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।

তিনি বলেছেন, "সব টাকা একসাথে দিতে পারবো না। আগামী দুই অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৬ সালের পহেলা জুলাই ২০২৭ এর মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে দেওয়া হবে। ২০২৮ থেকে ভাতা যোগ হবে। ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক ও সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি উপকার পাবেন"।

এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, "অনেক বেশি টাকা যে মানুষের হাতে পৌঁছে যাবে, এই যে একটা আশঙ্কা করছে- সরকার এত ব্যয় কোত্থেকে নির্বাহ করবে। ব্যয় বাড়বে, সে ব্যয়ের জন্য সরকারের বাজেট আছে"।

অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, সরকার আগামী এক বছরে পে স্কেল যেভাবে বাস্তবায়নের কথা বলেছে সেটি বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে ব্যাংক থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে এবং একই সাথে এমনিতেই সংকটের কারণে কম আসা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি আরও কাটছাঁট করতে হতে পারে।

মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে
ছবির ক্যাপশান, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে

চ্যালেঞ্জ ও প্রভাব

বাংলাদেশে সর্বশেষ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। অর্থাৎ একই কাঠামোতে ১১ বছর ধরে সরকারি চাকরিজীবীরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন।

অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭শে জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে।

পরে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার ওই কমিশনের সুপারিশমালা পর্যালোচনার জন্য আরেকটি কমিটি করে। তখন বলা হয়েছিল, পে-স্কেলের জন্য বাড়তি অর্থের যোগান বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ আয় অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের চিত্র ভালো নয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পে স্কেল বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থানের পাশাপাশি বেতন বৃদ্ধির প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং সরকার যথাযথ ভূমিকা না নিলে বেসরকারি খাত চাপের মুখে পড়বে।

"উপরের গ্রেডে যে হারে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে তা সরকারের ওপর চাপ তৈরি করবে। তবে নতুন পে স্কেল নীচের গ্রেডের লোকজনকে স্বস্তি দিবে, যার প্রয়োজন ছিল। তবে এক বছরের মধ্যে পে-স্কেলের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য অর্থের সংস্থান কিভাবে। এজন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এডিপি কাটছাঁটের ফলে সরকারে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সংকুচিত হয়ে আসবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সেন্টার পর পলিসি ডায়লগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের উচিত এর সাথে মিলিয়ে অতিরিক্ত জনবল ও প্রতিষ্ঠান কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা।

"খালি পদ কমানো ছাড়াও ব্যয় কমানোর জন্য বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় পদ ও বিভাগ অবলোপন এবং ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। আবার বেসরকারি খাতের ওপর যে চাপ পড়বে সেজন্যও সরকারকে প্রস্তুতি নিতে হবে," তিনি বলেন।

ধাপে ধাপে পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সরকার
ছবির ক্যাপশান, ধাপে ধাপে পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সরকার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক সায়মা হক বিদিশা বলছেন, জ্বালানির দাম ব্যাপক বেড়ে যাওয়া ও বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে বাংলাদেশ উৎপাদন খরচজনিত মূল্যস্ফীতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

"এর সাথে বেতন স্কেলের একেবারে সরাসরি সম্পর্ক নেই। আবার রাজস্ব আহরণ কম হচ্ছে। কিন্তু বেতন ভাতা তো দিতে হবে। এছাড়া বাজারে পণ্য সরবরাহে কৃত্রিম সংকট কিংবা অর্থায়নের জন্য ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করবে। যা মূল্যস্ফীতি তৈরি করতে পারে," বলছিলেন তিনি।

তার মতে, পে-স্কেলের কারণে বেসরকারি খাতের ওপর চাপ পড়বে এবং এই খাতে হতাশা তৈরি হবে। বিশেষ করে ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান, উৎপাদন ও সেবা খাতে চাপ পড়বে।

সে কারণে সরকারকে বেসরকারি খাতেও সামঞ্জস্য আনতে হবে, বিশেষ করে উৎপাদন খরচ কমানো ও ব্যবসা সহজ করতে সহায়তা দিতে হবে যাতে তাদের উৎপাদন খরচ কমে আসে। এজন্য ইনসেন্টিভ দেওয়া যেতে পারে যাতে ধাপে ধাপে যাতে ব্যক্তিখাত বেতন বাড়াতে পারে।

"দাম বাড়ার কথা বলে মজুতদারি হবে। এগুলো যাতে না হতে পারে সেটি দেখতে হবে। বিদ্যুৎ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে ব্যক্তিখাতকে স্বস্তি দিতে হবে। তারা যাতে কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা এডজাস্ট করতে পারে। সরকারকেও তাদেরকে বোঝাতে হবে যে বেতন বাড়ানো সবার জন্য যৌক্তিক," বলেছেন সায়মা হক বিদিশা।