হিমবাহ ধসে যেভাবে নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হলো, যা বলছেন বিজ্ঞানীরা

লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের একটি প্যানোরামিক দৃশ্য। পরিষ্কার নীল আকাশের পটভূমিতে তুষারে ঢাকা চূড়াটি দেখা যাচ্ছে।
ছবির ক্যাপশান, বিজ্ঞানীরা বলছেন, লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহ ধসে পড়াই সম্ভবত এই বিপর্যয়ের কারণ
    • Author, তেসা অং
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার কারণ হিসেবে প্রাথমিক তদন্তে একটি হিমবাহ ধসে পড়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে করে হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলে যাওয়ার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

ভূমিকম্পের প্রাথমিক খবর পাওয়ার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ভূকম্পনের কারণেই ভূমিধস হয়েছিল এবং সেই ভূমিধস থেকেই বন্যার সৃষ্টি হয়। এই ঘটনায় অন্তত ৪৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা- ইউএসজিএস পরে জানায়, 'হিমবাহ ধসে পড়া'র কারণে এই দুর্যোগ ঘটে, যেখানে কোনো হিমবাহ বা হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ইউএসজিএস'র তথ্য এবং ঘটনাটি বিশ্লেষণ করা বিজ্ঞানীদের মতে, ধসে পড়া হিমবাহ উপত্যকার তলদেশে আঘাত হানার সময় এতটাই শক্তিশালী অভিঘাত তৈরি হয়েছিল যে, সেটি পাঁচ দশমিক দুই মাত্রার কম্পন হিসেবে রেকর্ড হয়।

ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ড. সাইমন কুক বিবিসিকে বলেন, তার দলের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নেপালে লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়েছে। ওই স্থানটি বন্যাকবলিত এলাকা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার (৯ মাইল) পশ্চিমে।

তার ধারণা, হিমবাহটি উত্তর-পশ্চিম দিকে ধসে পড়ে, আর তারপর পানির স্রোতের সঙ্গে নিচে পশ্চিমের দিকে নেমে আসে।

নেপাল-তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে বন্যার পরবর্তী সময়ে একটি গাড়ির পাশে মাটিতে বসে থাকা এক মহিলাকে ঘিরে দুজন মহিলা জড়ো হয়েছেন। একজন মহিলার পিঠে একটি ছোট শিশু রয়েছে।
ছবির ক্যাপশান, নেপালের রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলায় আকস্মিক বন্যায় ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং শত শত মানুষ নিখোঁজ হয়েছে

আন্তঃসরকারি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট – আইসিআইএমওডি'র এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, 'অনেক উপরের কোনো এলাকা থেকে বরফ-পাথরের ধস' নেমে থাকতে পারে।

এর ফলে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ ভোটেকোশী নদীর একটি শাখা নদী লেন্দে খোলায় গিয়ে পড়ে। নদীতে হঠাৎ পানির প্রবল স্রোত তৈরি হয়, যা পানি, পলি এবং বড় বড় পাথর ভাটির দিকে বয়ে নিয়ে যায়।

কেন্দ্রটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ভাটির দিকের নদীগুলোতে পানির উচ্চতা সাত থেকে নয় মিটার বেড়ে যায়। পানির তোড়ে বেশ কয়েকটি পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ভেসে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নেপালে বন্যায় ভেঙে যাওয়া এলাকা

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্সেসের অধ্যাপক মাইক সার্ল বলেন, ভূমিধস থেকে বন্যা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটতে কয়েক ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিনও লেগে থাকতে পারে।

"ধ্বংসাবশেষের বিপুল ঢেউ দেখে মনে হচ্ছে, প্রথমে হয়তো ভূমিধস হয়েছিল। এরপর পানি জমে নদীর প্রবাহ আটকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেটি বাঁধ ভেঙে এক বিশাল বন্যার আকারে নেমে আসে", বিবিসিকে বলেন তিনি।

এলাকার ভূপ্রকৃতিও বন্যার ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে থাকতে পারে। সার্ল জানান, লাংটাং লিরুং উচ্চ হিমালয়ের চূড়ায় অবস্থিত এবং পর্বতটির দুই পাশে রয়েছে "অত্যন্ত খাড়া উপত্যকা"। এসব উপত্যকা পানিকে আরও বেশি গতিতে নিচের দিকে প্রবাহিত করে থাকতে পারে।

হ্যান্ডআউট ভিডিও থেকে নেওয়া এই স্ক্রিনশটে, হেলিকপ্টার থেকে ধারণ করা ফুটেজে ২৬ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে নেপালের রাসুয়া উপত্যকায় আকস্মিক বন্যা দেখা যাচ্ছে।
ছবির ক্যাপশান, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ছবিতে ক্ষতিগ্রস্ত উপত্যকার খাড়া ঢালগুলো দেখা যাচ্ছে
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

কিন্তু হিমবাহটি কেন ধসে পড়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সার্ল বলেন, হিমালয়ের অন্যান্য এলাকার মতো লাংটাং লিরুংও দীর্ঘমেয়াদি টেকটোনিক গতিবিধির কারণে ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে। এ প্রক্রিয়ায় একটি ভূত্বকীয় প্লেট আরেকটি প্লেটকে ওপরে ঠেলে দেয়।

"এটা অনেকটা গাড়ির নিচে জ্যাক বসিয়ে সেটি ওপরে তোলার মতো", বলেন তিনি।

"পর্বতটি যত ওপরে উঠছে, হিমবাহও তত খাড়া হয়ে উঠছে। ফলে এর কিছু অংশ খসে পড়া অনিবার্য।"

এসব ক্ষেত্রে সাধারণত তুলনামূলক ছোট ছোট বরফের খণ্ড খসে পড়ে, যা সাময়িকভাবে নদীর প্রবাহ আটকে দেয় এবং পরে সহজেই পানির স্রোতে ভেসে যায় বলে জানান তিনি।

কিন্তু এবারের দুর্যোগে মনে হচ্ছে, পুরো হিমবাহটি 'একসঙ্গে' ধসে পড়েছে, যা সার্লের ভাষায় "খুবই অস্বাভাবিক"। তিনি বলেন, "এ ধরনের বন্যা সব সময়ই হয়, কিন্তু এত বড় মাত্রায় নয়।"

সার্ল বলেন, বুধবারের ঘটনাটি সম্ভবত দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়ার কারণে ঘটেছে।

"একদিকে হিমালয়ের ভূত্বকীয় গতিবিধির কারণে পর্বতশ্রেণির ওপরে উঠে যাওয়া, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং হিমবাহ গলে যাওয়া।"

"এই সবকিছু মিলেই এমন ভয়াবহ দুর্যোগ তৈরি করছে, যা আমরা এখন নিয়মিতই দেখতে পাচ্ছি।"

নেপালে আকস্মিক বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর মাঝখান দিয়ে কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢাকা একটি রাস্তা দিয়ে তিনজন লোক হেঁটে যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ে বরফ ও পারমাফ্রস্ট - অর্থাৎ শত শত বছর ধরে জমাট হয়ে থাকা মাটি গলে যাওয়ার বিষয়ে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই সতর্ক করে আসছেন।

চলতি বছরের শুরুতে আইসিআইএমওডি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০০ সালের তুলনায় বর্তমানে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্বিগুণ হারে বরফ হারাচ্ছে। এর ফলে বন্যার মতো বিভিন্ন ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

ড. কুক উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত, সুইজারল্যান্ড ও ইতালিতেও হিমবাহ ধসে বন্যা ও ভূমিধসের একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

২০২১ সালে উত্তর ভারতের চামোলি উপত্যকায় হিমালয়ের একটি হিমবাহের বড় একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ও পানি ভাটির দিকে নেমে আসে এবং ২০০ জনের মৃত্যু হয়।

পরে বিজ্ঞানীরা হিসেব করে জানান, ওই ধসের অভিঘাত ছিল ১৫টি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের সমতুল্য।

এমনকি নেপালেও একই অঞ্চলে গত বছর তিব্বতে একটি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের বাঁধ ভেঙে বন্যা হয়েছিল।

আইসিআইএমওডির বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফারুক আজম বলেন, ক্রায়োস্ফিয়ারে - অর্থাৎ পৃথিবীর হিমায়িত অংশগুলোতে বিপদের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে এবং "আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন তা আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। পরিবর্তনের গতি এতটাই দ্রুত।"

কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে কি না, তা বলা কঠিন। তবে "এসব ঘটনার ধরন যখন আপনি দেখবেন, তখন মনে হবে এতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থাকতে পারে," বলেন ড. কুক।

"যুক্তিটা হলো, পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহের আকার ছোট হবে, বিপুল পরিমাণ তুষার গলবে। কিছু পর্বতের ঢালকে আংশিকভাবে ধরে রাখা পারমাফ্রস্ট উষ্ণ হয়ে গলতে এবং ক্ষয় হতে শুরু করছে।"

"ফলে আরও বেশি ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ, হিমবাহের গলিত পানি, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানি উপচে পড়া এবং হিমবাহ ধসে পড়ার ঘটনা ঘটবে। কারণ শেষ পর্যন্ত জলবায়ুর উষ্ণতা উচ্চ পার্বত্য এলাকাগুলোর পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে।"