সোহাগের ওপর ফিফার নিষেধাজ্ঞা: বাংলাদেশের ফুটবলে যে প্রভাব ফেলবে

বাংলাদেশের ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগ
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগ
Published

শুক্রবার ১৪ই এপ্রিল ফিফার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন বাফুফের সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগের ওপর দুই বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সংস্থাটি।

আন্তর্জাতিক ফুটবল পরিচালনা সংস্থা ফিফার এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় আগামী দুই বছর ফুটবল বিষয়ক কোন ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না মি. সোহাগ।

মি. সোহাগ ফিফার ডিসপিউট রেজ্যুলেশন চেম্বারের সাবেক সদস্য।

এরপর তিনদিন পেরিয়ে গেছে। মতিঝিলে বাফুফে অফিসে সাধারণ সম্পাদকের কক্ষের দরজা থেকে আবু নাঈম সোহাগের নামফলকটি নামিয়ে ফেলা হয়েছে।

এছাড়া বাফুফের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এর বাইরে কর্তৃপক্ষ এখনো পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে কার্যত নীরবতা বজায় রেখেছে।

বাংলাদেশের ফুটবল বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন এমন বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফল গোটা দেশের ফুটবলের ওপর পড়বে।

ফিফা

'সালাউদ্দিনের আমলের প্রথম ধাক্কা'

বাফুফে শীর্ষ পদে গত ১৫ বছর ধরে রয়েছেন এক সময়ের তারকা ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই সময়কালে বাংলাদেশের ফুটবলের অধঃপতন নিয়ে অনেক আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে, কিন্তু ফিফা যেভাবে বাফুফের আর্থিক দুর্নীতি প্রমাণসহ তুলে ধরেছে তা আগে হয়নি।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বাংলাদেশের ফুটবল লেখক সনৎ বাবলা মনে করেন, "এটা সালাউদ্দিনের আমলের প্রথম ধাক্কা"।

এই ধাক্কার রেশ সুদূরপ্রসারী হবে বলেই ধারণা করেন তিনি।

মি. বাবলা বলেন, "ফিফা যখন কোন বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এবং এভাবে বিবৃতি দেয় তার মানে ফিফার হাতে যথেষ্ট তথ্য উপাত্ত আছে এবং তারা এনিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছে।"

ফিফা এমন কিছু বিষয় নিয়ে তথ্য দিয়েছে যা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও ফুটবল সংশ্লিষ্টরা প্রমাণ না থাকার কারণে মুখ ফুটে বলতে পারেনি কখনো।

যেমন ​​২০১৬ সালে ফিফা ফরোয়ার্ড ফান্ড হিসেবে সাত লাখ ডলারের বেশি অর্থ পায় বাফুফে। কিন্তু এর মধ্যে নিয়ম মেনে খরচ করা হয় শুধু ৯০ হাজার ডলার।

এছাড়া ওই বছর নারী ফুটবলারদের বেতন ও বিদেশ সফর সংক্রান্ত এক লাখ ডলারের বেশি অর্থের কোনো ডকুমেন্ট অর্থাৎ নথি ছিল না।

ফিফার কাছ থেকে পাওয়া অর্থ থেকে বাংলাদেশের ক্লাবগুলোকে প্রায় সোয়া এক লাখ ডলার অনুদান দেয় বাফুফে, যে বিষয়টি ফিফাকে জানানো হয়নি।

এই লেনদেন সংক্রান্ত কোনো নথি তো বাফুফের কাছে ছিলই না, বরং এর মধ্যে প্রায় ৫৪ হাজার ডলার দেয়া হয় নগদ টাকায়, যা ফিফার নিয়ম বহির্ভূত।

এছাড়া ২০১৭ থেকে ২০২০ সময়কালে ফিফার নির্ধারিত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বড় অঙ্কের নগদ অর্থ উত্তোলন করে বাফুফে।

বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন অবশ্য গণমাধ্যমে বলেছেন, "বাফুফের কাছে তো টাকাই দেখি না আমি, যে দুর্নীতি হবে!"

তিনি সভাপতি হিসেবে সবকিছুর দায়িত্ব নেয়ার কথা বলছেন, কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, "আমি জানিনা।"

নিষেধাজ্ঞার ঘটনার পর বাফুফের আনুষ্ঠানিক সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে 'এ ঘটনা বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য লজ্জাজনক কি না' এমন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করেন সভাপতি মি. সালাউদ্দিন।

বাফুফে প্রেসিডেন্ট কাজী সালাউদ্দিন
ছবির ক্যাপশান, বাফুফে প্রেসিডেন্ট কাজী সালাউদ্দিন

'নিষেধাজ্ঞা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলেও প্রভাব সুদূরপ্রসারী'

বিশ্লেষক সনৎ বাবলা মনে করেন, বাংলাদেশ নিয়ে ফিফা যে তদন্ত শুরু করেছে, এটা শুরুতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলেও বাংলাদেশের ফুটবলে এর প্রভাব থাকবে।

তিনি বলেন, "সাধারণ সম্পাদক প্রধান সিগনেটরির একজন তাই তার নামে মূল অভিযোগ, কিন্তু আমরা যারা ফুটবল নিয়মিত অনুসরণ করি আমরা জানি বাংলাদেশের ফুটবল কোনও স্বচ্ছ জায়গা নয়।"

গত ১৫ বছর ধরে বাফুফের বিরুদ্ধে অভিযোগ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী লিগ পরিচালনা করতে না পারা, বিদেশি কোচদের নিয়মিত বেতন না দেয়া এবং একটা পর্যায়ের পরে বাংলাদেশ থেকে বেশিরভাগ কোচ একটা নেতিবাচক অবস্থানে চাকরি ছেড়েছেন।

কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার আগেই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অর্থ কোথায় খরচ হয়, সেই প্রশ্ন উঠেছিল।

বাংলাদেশের ফুটবলে আনন্দের উপলক্ষ্য নিয়ে আসা মেয়েদের দলটি সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ছয় মাসের মাথায় মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখেছে।

দলটির একজন সদস্য অভিযোগ করেছেন, সাফ জয়ের পরেও তারা নিয়মিত বেতন পাননি, দলের অনেক সদস্য প্রতিশ্রুত অর্থ পুরস্কার বুঝে পাননি।

এরপর সর্বশেষ এপ্রিল মাসের শুরুতে বেতন, বোনাস, ভালো বুট এবং ভালো খাবারের দাবিতে তিন দিন অনুশীলন বর্জন করেন বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের সদস্যরা।

সেসময়ই খবর আসে মিয়ানমারে হওয়া অলিম্পিক বাছাই পর্বে মেয়েরা যেতে পারছে না অর্থের অভাবে, এই খবর নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় হয় দেশের গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে।

সমালোচনার সাথে সাথে প্রশ্ন ওঠে, কোথায় খরচ হয় বাফুফের অর্থ?

সাবেক ফুটবলার রাশেদুল ইসলাম বলেন, "বাংলাদেশের ফুটবলে সম্প্রতি বলার মতো কিছু থাকলে সেটা মেয়েদের ফুটবল দিয়েই এসেছে, সেই মেয়েদের ফুটবল নিয়ে নয়ছয় বাফুফের জন্য স্বভাবতই ভালো কিছু বয়ে আনেনি।"

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাফুফের দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে এতো দিন যা ছিল মানুষের মুখে শোনা গল্প, তা এখন 'প্রাতিষ্ঠানিক সত্য'।

আর এটি সামনের দিনে বাংলাদেশের ফুটবলে ফিফার অর্থায়ন করার বিষয়টিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে বলে আশংকা বিশ্লেষকদের।

বাফুফে সংবাদ সম্মেলন
ছবির ক্যাপশান, ৩রা এপ্রিল বাফুফে ভবনে সংবাদ সম্মেলনে কাজী সালাউদ্দিন

আরো তদন্ত চান সাবেক ফুটবলাররা

নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসার পর তিনদিন পেরিয়ে গেছে। এখনো বাফুফের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপের কথা শোনা যায়নি।

প্রাতিষ্ঠানিক কোন ব্যবস্থা কিংবা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাফুফে কী করবে সে সম্পর্কে সংস্থাটি কিছু জানায়নি এখনো।

ফলে এখন সামনের দিনে বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যতের জন্য ঠিক কোন রাস্তায় কর্তৃপক্ষ এগোবে সে ধারণা করা কঠিন।

সাবেক ফুটবলারদের অনেকে মনে করেন, ফিফার পাশাপাশি বাংলাদেশের তরফ থেকেও ভালোমতো তদন্ত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সাবেক ফুটবলার শেখ আসলাম বলছেন, যে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তাতে শুধু সাধারণ সম্পাদকই জড়িত, তা তিনি মনে করেন না।

"এতো বড় বড় নাম এখন ফেডারেশনে তাদেরকে ছাপিয়ে শুধু আবু নাইম সোহাগের সিদ্ধান্তে সব হয়েছে তা কীভাবে হয়?," প্রশ্ন তোলেন তিনি।

আরেক সাবেক ফুটবলার আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু বলেন, "১৫ বছর দীর্ঘ সময়, এখনই গোটা কমিটির সরে যাওয়া দরকার"।

এই কমিটিকে ব্যর্থ আখ্যা দিয়েছেন সাবেক ফুটবলারদের অনেকেই।

তবে ক্রীড়া লেখক সনৎ বাবলা মনে করেন, বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য এটা একটা নতুন শুরুর সুযোগও হতে পারে, পুরো কাঠামো ঢেলে সাজানো যেতে পারে।