কৃষক কার্ড কারা পাবেন-কোথায় কবে দেওয়া হবে?

ছবির উৎস, BNP Media Cel
- Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- পড়ার সময়: ৭ মিনিট
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের দুই মাসের মাথায় বাংলাদেশে 'কৃষক কার্ড' চালু করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার।
এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে বীজ, সার, কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ ক্রয়, ফসল বিক্রি, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, বিমাসহ আরও বেশকিছু সুবিধা পাবেন বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
দরিদ্র কৃষকদের এই কার্ডের মাধ্যমে বছরে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন টাঙ্গাইলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
প্রাথমিকভাবে ১০টি জেলার ২২ হাজার কৃষকের মাঝে কার্ড বিতরণ করা হবে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে এটি সারা দেশের সকল কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
কার্ডের নামে 'কৃষক' শব্দটি থাকলেও এটি কেবল ভূমিচাষীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ঠিক কারা কারা পাবেন এই কার্ড? এটি তাদের কতটা কাজে আসবে?

ছবির উৎস, PM PRESS WING
দেড় কোটির বেশি কার্ড
সরকারি তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে কৃষক পরিবারের সংখ্যা এক কোটি ৬৫ লাখ।
এসব কৃষকদেরকে 'ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং বড় কৃষক' - এই পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে কার্ড দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
এর মধ্যে পাঁচ শতকের কম জমি রয়েছে যাদের, তাদেরকে ফেলা হচ্ছে ভূমিহীন ক্যাটাগরিতে।
পাঁচ থেকে ৪৯ শতক জমির মালিক যেসব কৃষক, তারা পড়ছেন প্রান্তিক শ্রেণিতে।
এর বাইরে, কৃষকদের মধ্যে যারা ৫০ থেকে ২৪৯ শতক জমির মালিক, তারা ক্ষুদ্র এবং যারা ২৫০ থেকে ৭৪৯ শতকের মালিক, তারা মাঝারি কৃষকের শ্রেণিতে পড়ছেন।
অন্যদিকে, যাদের জমির পরিমাণ ৭৫০ শতকের বেশি, তাদেরকে বড় কৃষক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার প্রাথমিকভাবে দেশের ১০টি জেলায় ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের মধ্যে কার্ড বিতরণ শুরু করতে যাচ্ছে সরকার।
তাদের মধ্যে দুই হাজার ২৪৬ জনই ভূমিহীন বলে রোববার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
বাকিদের মধ্যে প্রায় নয় হাজার ৪৫৮ জন প্রান্তিক কৃষক, আট হাজার ৯৬৭ জন ক্ষুদ্র কৃষক, এক হাজার ৩০৩ জন মাঝারি কৃষক এবং ৯১ জন বড় কৃষক রয়েছেন বলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
তালিকায় এগিয়ে ভূমিচাষীরা
পহেলা বৈশাখ যে ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের মধ্যে কার্ড বিতরণ শুরু হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই ভূমিচাষী বলে জানা যাচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, কার্ড পেতে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ফসল উৎপাদনকারী কৃষকের সংখ্যা ২১ হাজার ১৪১ জন।
তবে সংখ্যায় অংল্প হলেও কার্ডধারীদের তালিকায় মৎস্যজীবী, প্রাণিসম্পদ খাতে নিয়োজিত খামারি এবং লবণচাষীদেরও নাম রয়েছে।
এর মধ্যে গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালন এবং দুগ্ধ খামারির সংখ্যা প্রায় ৮৫৫ জন।
এছাড়া কার্ড পেতে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৬ জন মৎস্যজীবী এবং তিন জন লবণ চাষী রয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

ছবির উৎস, Screen Grab
বাস্তবায়ন হবে তিন ধাপে
কৃষক কার্ড প্রদান কর্মসূচিকে তিনটি ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে সরকার।
এর মধ্যে এখন চলছে প্রি-পাইলটিং বা প্রাক- পরীক্ষামূলক ধাপ।
এর আওতায় দরিদ্র কৃষকের সংখ্যা বেশি এমন ১০টি জেলার ১১টি উপজেলা অন্তর্ভূক্ত রয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষক নেতারা সমন্বয় করে এলাকাগুলোতে কৃষকদের তালিকা হালনাগাদ করেছেন বলে জানিয়েছেন তারা।
প্রি-পাইলটিং ধাপে ২২ হাজার কৃষকের মধ্যে কার্ড বিতরণ করা হবে। এই ধাপের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর আগামী অগাস্ট মাসের মধ্যে শুরু হবে পাইলট বা পরীক্ষামূলক কার্যক্রম।
কৃষকদের মধ্যে যে উদ্দেশ্যে কার্ড বিতরণ করা হয়েছে, সেটি ঠিকমত কাজ করছে কি-না তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
"পাইলাটিংয়ের অভিজ্ঞতার আলোকে (তৃতীয় ধাপে) আগামী চার বছরে সারা দেশে এই কার্ড বিতরণ ও ডাটাবেজ তৈরির কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে," বলেন কৃষিমন্ত্রী মি. রশিদ।

ছবির উৎস, Anadolu Agency via Getty Images
প্রথম ধাপে যেসব এলাকা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
প্রি-পাইলটিং ধাপের কৃষকের তালিকা তৈরি শেষে কার্ড বিতরণ করা হবে ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকে।
সেগুলোর একটি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সুরুজ ব্লক।
মঙ্গলবার বাংলা নববর্ষের প্রথমদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কৃষকদের হাতে কার্ড তুলে দিয়ে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
অন্য জেলাগুলোর কৃষি ব্লকের মধ্যে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার উথলি ব্লক, পঞ্চগড় সদর উপজেলার কমলাপুর ও বোদা উপজেলার পাঁচপীর ব্লক, ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার কৃপালপুর ব্লক, পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার রাজাবাড়ি ব্লক এবং কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার রাজারছড়া ব্লকে কার্ড বিতরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
এছাড়া রাজবাড়ির গোয়ালন্দ উপজেলার তেনাপচা ব্লক, মৌলভিবাজারের জুড়ী উপজেলার ফুলতলা ব্লক এবং জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গাইবান্ধা ব্লকেও ১৪ই এপ্রিল কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে এদিন কার্ড দেওয়া হবে না কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর উপজেলার অরণ্যপুর ব্লকে। এলাকাটিতে আগামী ১৭ই এপ্রিল কৃষক কার্ড দেওয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
কার্ড পেলে কী সুবিধা?
সাধারণ কৃষকদের তুলনায় কার্ডধারী কৃষকরা বাড়তি কিছু সুবিধা পাবেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, ন্যায্যমূল্যে সেচ প্রদানের সুবিধা, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রাপ্তি।
এছাড়া মোবাইল ফোনে সহজে বাজারের তথ্য ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ফসলের রোগ-বালাই দমনের পরামর্শ, কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও কৃষি বিমা সুবিধার পাওয়া যাবে।
সেইসঙ্গে, সরকারের কাছে ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের পাশাপাশি কৃষিতে সরকারি বিভিন্ন ভর্তুকি ও প্রণোদনার অর্থও কৃষকের জন্য পাওয়া সহজ হবে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী।
"কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা (সরকারি) প্রণোদনা ও সেবা নেবেন, সংশ্লিষ্ট ডিলারের সরবরাহ করা মেশিন ব্যবহার করে সার, বীজ, মৎস্য বা প্রাণিখাদ্যসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ কিনতে পারবেন," বলেন কৃষিমন্ত্রী মি. রশিদ।
এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বীজ বা সারের ব্যবসায়ী বা ডিলারের কাছে ডিজিটাল পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন রাখার ব্যবস্থা করবে সরকার, যাতে কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সহজেই লেনদেন সম্পন্ন করতে পারেন।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
সবাই টাকা পাবেন?
কার্ডের মাধ্যমে কৃষককে বছরে অন্তত আড়াই হাজার নগদ টাকা প্রদান করা হবে বলে জানিয়েছে সরকার।
তবে কার্ডধারীদের সবাই এই সুবিধা পাবেন না।
কেবল ভূমিহীন, প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র কৃষকরা এই সুবিধার আওতাধীন হবেন বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী।
প্রাথমিকভাবে যে ২২ হাজার কৃষকের মধ্যে কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে ২০ হাজার ৬৭১ জনই ভূমিহীন, প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র কৃষক।
ফলে তারা সবাই প্রতিবছর ওই টাকা পাবেন।
কর্মকর্তারা বলছেন, সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় পর্যায়ের শাখায় এসব কৃষকদের কার্ডের বিপরীতে একটি করে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে।
ওই অ্যাকাউন্টে প্রতিবছর টাকা পাঠানো হবে। ফলে কার্ডটি আদতে একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড হিসেবে ব্যবহার হবে।
কৃষকদের এই অর্থ সহায়তাসহ সব মিলিয় প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে ব্যয় করার জন্য প্রায় আট কোটি ৩৪ লাখ টাকা বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে।

ছবির উৎস, Anadolu Agency via Getty Images
কাজে আসবে কতটা?
চাষী ও খামারিদের সুবিধার কথা ভেবে সরকার নতুন যে বিশেষ কার্ড চালু করতে যাচ্ছে, সেটাকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধারণ কৃষকরা।
"কার্ডের মাধ্যমে যদি আমরা ন্যায্যমূল্যে সময়মত সার-বীজ পাই বা সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারি, তাহলে তো সেটা অবশ্যই ভালো খবর," বলছিলেন কুমিল্লার কৃষক রহমত উল্লাহ।
তবে এই উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত কতটা কাজে লাগবে, সেটি নিয়েও কারো কারো মধ্যে সংশয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
"উদ্যোগটা যদি বাস্তবে প্রতিফলন হয়, তাহলে অবশ্যই এই জিনিসটা কৃষকের জন্য সুবিধাজনক বা লাভজনক হইতে পারে। তবে এ বিষয়টা বাস্তবায়ন কতটুকু সম্ভব হবে তা জানি না," বিবিসি বাংলাকে বলেন মুন্সিগঞ্জের কৃষক নাহিদ খান।
কৃষকদের এমন সংশয় প্রকাশের প্রধান কারণ অতীতের খারাপ অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশে এর আগেও বিভিন্ন সময় কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জন্য বিশেষ কার্ড চালু করার উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে।
এর মধ্যে ২০০৭ সালে কৃষকদের জন্য 'কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড' চালু করেছিল তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে দশ টাকার কৃষকদের ব্যাংক হিসাব খোলা এবং জেলেদের জন্য আলাদা কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল।
কিন্তু এগুলোর কোনোটাই পরবর্তীতে সেভাবে কাজে আসতে দেখা যায়নি বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, আগের উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম বড় কারণ অনিয়ম-দুর্নীতি।
প্রযোজ্য ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে অনেকক্ষেত্রে 'রাজনৈতিক বিবেচনায়' অন্য ব্যক্তিদেরকে তালিকায় রেখে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও উঠতে দেখা গেছে।
"যাদে জন্য উদ্যোগটা নেওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে যদি আলাপ-আলোচনা না করা হয় এবং তারা যদি সুফল না পায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সেটি কাজ করবে না," বিবিসি বাংলাকে বলেন গবেষক গওহার নঈম ওয়ারা।
যদিও এবার তেমনটি ঘটবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে সরকার।
"এই কৃষক কার্ড শতভাগ রাজনৈতিক মুক্ত। অতীতে যা হয়েছে, তা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই", বলেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।







