প্রায় নির্মূল হওয়া হাম আবার দেশে দেশে ফিরছে কেন

যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনাতে চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে ৮৭৬ জনের আক্রান্ত হবার খবর পাওয়া গেছে।

ছবির উৎস, Sean Rayford/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনায় চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে ৮৭৬ জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সন্দেহজনক হাম রোগে বুধবার পর্যন্ত গত এক মাসে ১৬৬টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং এ সময়ে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজারের বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম পরিস্থিতি বাংলাদেশে এখন অনেকটা প্রাদুর্ভাবের রূপ ধারণ করেছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় আইসোলেশন ওয়ার্ড ও আইসিইউ সুবিধা প্রস্তুত করার কথা জানিয়েছে সরকার।

যদিও দেখা যাচ্ছে, হাম শুধু বাংলাদেশই না, বরং যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার মতো উন্নত দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই সতর্ক করে বলেছে, টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বিশ্বের কিছু অঞ্চলে আবার হাম রোগের পুনরুত্থান দেখা যাচ্ছে।

চিকিৎসা বিষয়ক জার্নাল দ্য ল্যানসেট এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক হাম প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের মতো নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে টিকার ঘাটতির কারণে হাম প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি তৈরি হলেও উন্নত বিশ্ব কিংবা বিশ্বজুড়ে নানা দেশে হামে আক্রান্ত হওয়ার পরিমাণ বাড়ছে কেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড মহামারীর সময়ে সারাবিশ্বেই শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ব্যাঘাতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে টিকাবিরোধী প্রচারণাও বেড়েছে, যা হাম সংক্রমণ ফিরে আসার পথ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশেও হাম ফিরে আসার জন্য ঠিকমতো টিকা দিতে না পারাকেই দায়ী করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল।

তিনি বলেছেন, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির পর আবার চার বছর পরপর একই কর্মসূচি হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।

ফলে বহু শিশু পরবর্তীতে টিকার বাইরে থেকে গেছে এবং টিকা সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ৫ই এপ্রিল থেকে হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যেখানে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে।

কানাডার একটি হাসপাতালে ইলেকট্রনিক বিলবোর্ডে হাম সংক্রমণ নিয়ে যোগাযোগের ওয়েবসাইটের ঠিকানা দেখানো হচ্ছে

ছবির উৎস, Photo by GEOFF ROBINS/AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশ্বের অনেক দেশে হামে সংক্রমিত হওয়ার সংখ্যা বেড়েছে, ছবিটি কানাডার

বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও হাম

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী টিকাদানের ঘাটতির কারণে ২০২৩ সালে ৫৭টি দেশে বড় বা গুরুতর হাম প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এটি আগের বছরে ৩৬টি দেশের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কার্যক্রমের আওতাধীন আফ্রিকান, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয়, ইউরোপীয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যায় ব্যাপক বৃদ্ধি দেখা গেছে। এই প্রাদুর্ভাবের প্রায় অর্ধেকই দেখা গেছে আফ্রিকা অঞ্চলে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড মহামারির সময়ে বিশ্বজুড়ে সার্বিক টিকাদান কর্মসূচিতে যে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটেছিল তারই বহিঃপ্রকাশ হলো হামের মহামারি কিংবা মহামারির মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া।

এছাড়া টিকার কার্যকারিতা হ্রাস কিংবা ভাইরাসের নতুন ধরন তৈরি হয়েছে কি-না সেই প্রশ্নও উঠছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশে টিকাবিরোধী প্রচারণাও হামকে প্রবল বেগে ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছে কি-না সেই আলোচনাও আছে।

দ্য ল্যানসেট গত মাসেই 'গ্লোবাল রিসার্জেন্স ইন মিজলস' শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

এতে বলা হয়েছে, হাম রোগের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাব এই রোগ নির্মূলের ক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রগতিকে পিছিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত বছর ২৮শে নভেম্বর যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল যেখানে বলা হয়েছিল, ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে হাম রোগীর আনুমানিক সংখ্যা ৭১ শতাংশ কমে ৩৮ মিলিয়ন (তিন কোটি ৮০ লাখ) থেকে ১১ মিলিয়নে (এক কোটি ১০ লাখ) নেমে এসেছে।

একই সময়ে, হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ৮৮ শতাংশ কমে সাত লাখ ৭৭ হাজার থেকে ৯৫ হাজারে দাঁড়ায়।

ল্যানসেট বলছে, এই অগ্রগতি মূলত দুই ডোজের হাম টিকাদানের হার বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।

প্রথম ডোজের টিকার বৈশ্বিক কভারেজ ২০০০ সালের ৭১ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৮৪ শতাংশে উন্নীত হয়। পাশাপাশি টিকার দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ ওই একই সময়ে ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৬ শতাংশে পৌঁছায়।

ঢাকার হাসপাতালগুলোতে বহু শিশু চিকিৎসাধীন

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকার হাসপাতালগুলোতে বহু শিশু চিকিৎসাধীন

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সিডিসি বলছে, ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হাম নির্মূল ঘোষণা করা হলেও, টিকা না নেওয়া আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের কারণে দেশটিতে এখনো হাম রোগের সংক্রমণ ও প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে।

২০১৯ সালে নিউইয়র্কে বড় একটি প্রাদুর্ভাবসহ মোট প্রায় ১৩শ হাম রোগের ঘটনা এবং আরও ৩০টি অঙ্গরাজ্যে সংক্রমণ দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় তার 'হাম নির্মূল' মর্যাদা হারাতে বসেছিল।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হাম সংক্রমণ দেখা দিয়েছে এমন দশটি দেশের একটি তালিকা প্রকাশ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেখানে শীর্ষে ছিল ভারত।

২০২৫ সালের অগাস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ তালিকা করার কথা জানায় সংস্থাটি।

এতে ওই ছয় মাসে ভারতে ১২ হাজার ১৩৫, অ্যাঙ্গোলায় ১১ হাজার ৯৪১, ইন্দোনেশিয়ায় আট হাজার৮৯২, ইয়েমেনে আট হাজার ৫০৭, পাকিস্তানে সাত হাজার ৫২৭, ক্যামেরুনে পাঁচ হাজার ৮৮, মেক্সিকোতে চার হাজার ৬৩৬, সুদানে চার হাজার ৭১, কাজাখস্থানে তিন হাজার ৮২৬টি হামের ঘটনার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ই মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফোকাল পয়েন্ট (এনএফপি) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-কে দেশটিতে হাম প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে অবহিত করে।

২০২৫ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে ২০শে মার্চ পর্যন্ত মোট ১৭টি অঙ্গরাজ্যে ৩৭৮টি হাম রোগের ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে। এছাড়া, দুটি মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।

কিন্তু এই প্রাদুর্ভাবের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আবার টিকার কার্যকারিতা কমে গেছে এমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

একটি প্যাকেটের সামনে হামের টিকার তিনটি বোতল এবং একজনের হাতে আরেকটি

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্রেও হাম বেড়েছে; বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কোভিড মহামারীর সময়ে বিশ্বব্যাপী শিশুদের টিকাদান ঠিক মতো হয়নি বলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে

সারাবিশ্বেই কেন বাড়ছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড মহামারির সময়ের সার্বিক টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটায় পরপর তিন বছর শিশুদের অনেকেই যথাসময়ে টিকা পায়নি।

সাধারণত টিকাদান কর্মসূচিতে একটি শিশুকে ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হাম রুবেলার টিকা দেওয়া হয়।

যদিও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে আর কম বয়েসি শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য এসেছে। বাংলাদেশ সরকার এখন ছয় মাস বয়স থেকেই শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ সারা দুনিয়াতেই হামের যে প্রাদুর্ভাব বেড়েছে তার কারণ বের করার জন্য চেষ্টা চলছে।

"যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি এখন চূড়ান্তভাবে জানায়নি। ভাইরাসের নতুন কোনো ভ্যারিয়েন্ট এসেছে কি-না তা নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। তবে এটাও ঠিক টিকাবিরোধী প্রচারণা বিভিন্ন দেশে সক্রিয়। তবে ধারণা করা হচ্ছে কোভিড মহামারিই হামের এভাবে ফিরে আসার ক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা রাখছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলছেন যে, একদিকে কোভিডের সময় তৈরি হওয়া ঘাটতি পূরণ করা যায়নি এবং একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক বিভিন্ন সংস্থায় অর্থায়ন বন্ধ করায় অনেক দেশে টিকা কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে।

"সারা বিশ্বেই কোভিডের সময় যাদের হামের জন্য নির্ধারিত ৯ ও ১৫ মাসে টিকা দেওয়া যায়নি তাদের ঘাটতি তো আর পূরণ হয়নি। আবার বাংলাদেশের মতো অনেক দেশে ঠিকমতো ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনও হয়নি। পাশাপাশি টিকার কার্যকারিতা, ভ্যারিয়েন্টে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি-না তাও আলোচনায় আছে। তবে এখনো টিকা ফাঁকি দিতে সক্ষম এমন নতুন ভ্যারিয়েন্ট এসেছে কি-না তার প্রমাণ মেলেনি," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

মি. হোসেন বলেন, "বাংলাদেশে হামে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। ইউরোপ-আমেরিকায় কম। আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিই তো টিকার বিরুদ্ধে। তবে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে সমস্যা বেশি হচ্ছে"।