ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যা কেন হয় এবং এর পূর্বাভাস পাওয়া কি সম্ভব?

২০২৬ সালের ২৭শে আগস্ট নেপালের নুয়াকোট জেলার বিদুর পৌরসভার দেবীঘাটে আকস্মিক বন্যার পর কাদা-জলে ডুবে থাকা বাড়িঘরের একটি ছবি।
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

নেপালে ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যায় বিপুল প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া আট শতাধিক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছে।

তিব্বতের দিকে নিখোঁজের সংখ্যা সাড়ে পাঁচশ জনের বেশি। তবে এই সংখ্যা নেপালের সংখ্যা থেকে পুরোপুরি আলাদা কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

এর আগেও বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যার খবর গণমাধ্যমে এসেছে।

কিন্তু এই ফ্ল্যাশ ফ্লাড কী? কেন এটা হয়? আর আগের থেকে কি এই বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে?

ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যা কী?

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা বলছে, আকস্মিক বন্যা হলো হঠাৎ ও অপ্রত্যাশিতভাবে সৃষ্ট পানির প্রবল স্রোত যা গিরিখাত, সংকীর্ণ খাদ, উপত্যকা বা অন্যান্য নিচু ও সংকীর্ণ এলাকা দিয়ে দ্রুত প্রবাহিত হয়।

আকস্মিক বন্যা যেকোনো জায়গায় ঘটতে পারে।

সাধারণত বন্যার সময় নদনদীর পানি তুলনামূলক ধীরগতিতে বাড়ে। এক সপ্তাহ বা তার বেশি সময় টানা বর্ষণের ফলে নদীর পানি বেড়ে যায় এবং গুরুতর আকার ধারণ করে।

অন্যদিকে আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে অনেক সময় তিন থেকে চার ঘণ্টার বৃষ্টিপাতেই ব্যাপক বন্যা হয় এবং নদীর পানি শুকনো অবস্থা থেকে একেবারে কূল ছাপিয়ে প্রবাহিত হবার অবস্থায় চলে আসে বলে জানান বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র - এফএফডব্লিউসি এর নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান।

আকস্মিক বন্যা প্রায়ই বজ্রঝড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ভারী বৃষ্টিপাত অথবা পাহাড়ে তুষার ও বরফ দ্রুত গলে যাওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়। তবে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণেও এ ধরনের বন্যা হতে পারে।

এই বন্যা সাধারণত স্বল্পস্থায়ী হয়; কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই পানির উচ্চতা বেড়ে আবার কমে যায়। তবে এর আকস্মিক সূত্রপাত অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক হতে পারে।

ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, কিছু আকস্মিক বন্যায় এত শক্তিশালী পানির দেয়াল তৈরি হয় যে তা নদীর তলদেশ ভাসিয়ে নিতে, স্থাপনাগুলোকে তাদের ভিত্তি থেকে উপড়ে ফেলতে, সড়ক ও সেতু ধ্বংস করতে এবং বড় গাছ ভেঙে ফেলতে বা উপড়ে ফেলতে পারে।

আকস্মিক বন্যা আবহাওয়াজনিত সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম।

প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি এতে মানুষ মারা যায়। অধিকাংশেরই মৃত্যু হয় পানিতে ডুবে।

নেপালের নুয়াকোট জেলায় বুধবারের আকস্মিক বন্যার পরবর্তী পরিস্থিতি
ছবির ক্যাপশান, নেপালের নুয়াকোট জেলায় বুধবারের আকস্মিক বন্যা পরবর্তী পরিস্থিতি

আকস্মিক বন্যা কী কারণে হয়?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

অনেক কারণেই আকস্মিক বন্যা হতে পারে। তবে এর প্রধান কারণ অতিবৃষ্টি।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের তথ্যমতে, আকস্মিক বন্যা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে অথবা ভূমিধস থেকেও ঘটতে পারে।

বৃষ্টিপাতের তীব্রতা, বৃষ্টির অবস্থান ও বিস্তৃতির মতো বিষয়গুলো আকস্মিক বন্যা কত দ্রুত ঘটতে পারে এবং কোন কোন এলাকায় তা দেখা দিতে পারে তার নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।

এছাড়া ভূপ্রকৃতির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যও পানির স্তর কত দ্রুত বাড়বে এবং বন্যা কতটা বিস্তৃত হবে, তা প্রভাবিত করতে পারে।

খাড়া ঢালযুক্ত এলাকা যেমন পাহাড় বা টিলা এবং শক্ত মাটি, পাথর, ছাদ, সড়ক ও অন্যান্য পাকা স্থানের মতো পানি শোষণ করতে না পারা পৃষ্ঠের বিস্তীর্ণ অঞ্চল পানিকে তুলনামূলক দ্রুত প্রবাহিত করে নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত করতে পারে।

একইভাবে, সাম্প্রতিক দাবানলে যেখানে বিস্তীর্ণ এলাকার উদ্ভিদ পুড়ে গেছে, সেসব এলাকাতেও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেশি।

এর বিপরীতে, মৃদু ঢাল, ঘন উদ্ভিদ এবং পানি শোষণ করতে সক্ষম মাটিযুক্ত ভূপ্রকৃতিতে তুলনামূলকভাবে ধীরে পানি প্রবাহিত হয়।

এছাড়া উষ্ণ জলবায়ুও আকস্মিক বন্যার ঘটনা ও তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে।

বায়ুর গড় তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা বা জলীয়বাষ্প ধারণের ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাক-শিল্পযুগের তাপমাত্রার তুলনায় প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস ( এক দশমিক আট ডিগ্রি ফারেনহাইট) উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতার ঘনত্ব সাত শতাংশ করে বাড়তে পারে।

এই অতিরিক্ত আর্দ্রতা আরও বেশি বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে।

ফলে ভারী বৃষ্টির কারণে যেসব অঞ্চলে আগে থেকেই আকস্মিক বন্যার প্রবণতা রয়েছে, সেখানে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে এবং একই সঙ্গে এর তীব্রতাও বাড়তে পারে।

নেপালের ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তন ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে বলে অনেকে ধারণা করলেও এনিয়ে বলার সময় এখনো হয়নি বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

পাহাড়ের উপকূল ঘেঁষে একটি নদী বেয়ে আসা প্রবল বন্যায় অনেক ঘরবাড়ি ভেঙে ও ভেসে গেছে
ছবির ক্যাপশান, নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, শত শত পর্যটকের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না

আগে থেকে কি আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব?

বিশেষজ্ঞদের মতে, মৌসুমি বন্যার মতো আকস্মিক বন্যারও পূর্বাভাস পাওয়া যায়। তবে এক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জটি থাকে সময়ের।

অর্থাৎ, অন্য সময়ে যেমন সার্বিক পরিস্থিতি মিলিয়ে হাতে সময় থাকতে আগাম প্রস্তুতির পূর্বাভাস দেওয়া যায়, হুট করে হওয়ার কারণে আকস্মিক বন্যার সময় সেই সময়টি থাকে খুবই সীমিত।

"এর মূল কারণ হচ্ছে প্রধান নদীর অববাহিকা সাধারণত বড় হয় এবং এক্ষেত্রে তথ্যের প্রাপ্যতাও সহজ থাকে। অন্যদিকে আকস্মিক বন্যা সাধারণত পাহাড়ি অববাহিকায় হওয়ার কারণে তথ্যের ঘাটতি থাকে", বলছিলেন মি. রায়হান।

মানে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তথ্য পাঠানোর জন্য হাইড্রোলজিক্যাল বা মেটারোলজিক্যাল স্টেশন সংখ্যায় কম থাকায় আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে দ্রুততার সাথে তথ্য পাওয়ার বিষয়টি বেশ জটিল করে তোলে।

মি. রায়হান জানান, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা – ডব্লিউএমও'র সংজ্ঞা অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার আগাম পূর্বাভাসকে 'নির্ভরযোগ্য লিড টাইম' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বর্তমান রাডার, স্যাটেলাইট ও অটোম্যাটিক সেন্সরের মতো প্রযুক্তি বসিয়ে দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে কাজ করা হচ্ছে।

কাদায় ডুবে আছে কয়েকটি ভবন
ছবির ক্যাপশান, বুধবার ত্রিশূলীতে বন্যায় নুয়াকোটের বিদুর এলাকার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়

এ নিয়ে নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সুদীপ ঠাকুরি বলেন, এ ধরনের প্রাকৃতিক আবহাওয়াজনিত ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেতে পারে।

"আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। হিমবাহের ওপর এবং এর আশপাশে স্থাপন করা এসব ব্যবস্থা হ্রদের পানির স্তর এবং বাঁধের পরিস্থিতি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করে। এ ধরনের ঘটনা সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া গেলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব", বলেন তিনি।

তবে 'আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা' কার্যকর থাকলেও আন্তর্জাতিক মাত্রার ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ে সমন্বয় আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

বুধবার নেপালের আকস্মিক বন্যার বিষয়ে দেশটির ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলচক ক্যাম্পাসের ডিজাস্টার স্টাডিজ সেন্টার এট দ্য ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং স্টাডিজের পরিচালক বসন্ত অধিকারী বলেন, "(বন্যাটি) যদি নেপাল থেকে সৃষ্টি হতো, তাহলে আমরা এখান থেকে তা দেখতে পারতাম। কিন্তু আমরা এখন যে ধরনের ঘটনা দেখছি, সেগুলোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক তথ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এই মুহূর্তে সেটি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।"

"যেসব এলাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটে, সেখানে কোনো জনবসতি নেই। মানুষের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করা কঠিন হওয়ায় স্যাটেলাইট স্টেশন স্থাপন করে সেখান থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা উচিত," বলেন ওই কর্মকর্তা।

"তা না হলে আমাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হতে হবে, কারণ সীমান্তের (নেপাল-চীন) নিচের দিকে আমাদের জনবসতিগুলো অবস্থিত।"

নেপালের কিছু নদী অববাহিকায় এ ধরনের ব্যবস্থা স্থাপন করা হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে এর ব্যবহার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠাকুরি বলেন, "এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নদীর তীরবর্তী জনবসতিগুলোও অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে। প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি রোধে সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হলো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জনবসতি গড়ে না তোলা।"