আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
নতুন পে-স্কেলে জুলাই থেকে কি বাড়ছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন?
- Author, মরিয়ম সুলতানা
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৭ মিনিট
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বা নবম পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। জুলাইতে শুরু হতে যাওয়া নতুন অর্থবছর থেকেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির আভাস দেওয়া হয়েছে সরকারের তরফ থেকে। তবে কী হারে বা কতটা বাড়ছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বলেছেন যে আগামী বাজেটে নতুন বেতন কাঠামো বা নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন হবে। কীভাবে সেটি হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
সরকার চাচ্ছে আগামী তিন বছরে এই বেতন কাঠামোকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু সরকারি চাকরিজীবীরা শুরু থেকেই নতুন বেতন কাঠামো আশা করছেন।
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে।
জুলাই থেকে বেতন বাড়বে, তবে 'তিন ধাপে'
সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সচিবালয়ে আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট সংক্রান্ত দু'টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে অন্যান্য অনেক বিষয়ের পাশাপাশি নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো'র একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশই আমলে নিচ্ছে বর্তমান সরকার।
কমিটির সুপারিশ হচ্ছে, তিন অর্থবছরে তিন ধাপে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা। প্রথম দুই অর্থবছরে দেওয়া হবে ৫০ শতাংশ করে মূল বেতন। আর তৃতীয় অর্থবছরে দেওয়া হবে ভাতা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এতে নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আগামী বাজেটেই নতুন বেতনকাঠামো নিশ্চিতভাবে বাস্তবায়ন হবে।"
"তবে বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, এ নিয়ে কথাবার্তা চলছে," বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
সরকার কি এই নবম পে-স্কেল এবারের বাজেটেই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করবে, নাকি ধাপে ধাপে করবে? জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, "(বাস্তবায়ন) এ বাজেটে শুরু হবে।"
আর শেষ পর্যন্ত সরকার মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী-ই এই পে স্কেল বাস্তবায়ন করবে নাকি করবে না, সে নিয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
অন্তর্বর্তী সরকারের বেতন কমিশনের সুপারিশে যা ছিল
২০২৫ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো তৈরির জন্য সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গঠন করা হয়।
ওই কমিশন গত ২১শে জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
সেসময় কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান বলেন, "গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতির প্রায় সকল সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়োপযোগী ও যথাযথ বেতন কাঠামো নির্ধারণ না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে।"
সেই কমিশন তখন সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি স্কেলে বেতন সুপারিশ করে। সর্বনিম্ন বেতন স্কেল আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়।
কমিশনপ্রধান তখন জানান, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে আরো এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং নয় লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
বেতন কত শতাংশ বাড়বে?
বেতন বাড়ানোর যে পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে, সেটি বাস্তবায়ন হলে একজন সরকারি কর্মকর্তা আগামী জুলাই মাস থেকে তার মূল বেতনের অর্ধেক পরিমাণ বাড়তি টাকা পাবেন।
যেমন, কারও মূল বেতন যদি হয় ৫০ হাজার টাকা, তাহলে তিনি জুলাই মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত ৭৫ হাজার টাকা বেতন পাবেন। পরের বছর থেকে পাবেন এক লাখ।
এই দুই বছর তিনি তার বাকি ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা আগের মতোই পাবেন।
এরপর তৃতীয় বছরের জুলাই মাসে গিয়ে ওই সরকারি কর্মকর্তা বাড়তি যোগ হওয়া মূল বেতনের পাশাপাশি নতুন বেতনকাঠামো অনুসারে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা ও সুবিধা পেতে শুরু করবেন।
অন্যান্য ভাতা ও সুবিধার মাঝে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা, এমনকি শিক্ষা ভাতাও রয়েছে। পাশাপাশি, নতুন পে স্কেল অনুযায়ী পেনশন সুবিধাও বাড়ানো হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের কমিশনের প্রতিবেদনেও সুপারিশ করা হয়েছে, কোনো কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে, তাকে দুই হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে। তবে এক্ষেত্রে শর্ত ছিল যে, সকল ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ দু'জন সন্তান এই সুবিধা পাবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য প্রচলিত মাসিক টিফিন ভাতা ২০০ টাকার স্থলে এক হাজার টাকা করা যেতে পারে।
তবে ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাস পর নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে গত ২৩শে এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি তিন ধাপে বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করে।
কিন্তু বেতন কত শতাংশ বাড়বে, কী হারে বাড়বে, কমিশনের প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো অনুসরণ করা হবে নাকি সেখানে পরিবর্তন আনা হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে বেতন কাঠামো বাড়বে এবং জুলাই থেকেই সেটি কার্যকর হবে বলে সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন।
মূল বেতন বাড়ার ফলে বাড়িভাড়া ও ভাতার অঙ্কও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে।
যেমন, সরকারি চাকরিজীবীরা এত দিন মূল বেতনের ২০ শতাংশ বৈশাখী ভাতা পেয়ে আসছিলেন। এ হার বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এত দিন ১১তম থেকে ২০তম ধাপের চাকরিজীবীদের জন্য যাতায়াত ভাতা ছিল। এ যাতায়াত ভাতা নতুন বেতন কমিশন ১০ম থেকে ২০তম ধাপ পর্যন্ত দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, বেতন-ভাতা কত ধাপে বাড়ানো হবে, তা তাদের দেওয়া সুপারিশে ছিল না।
"সম্পদ, সীমাবদ্ধতা থেকে শুরু করে সবকিছু বিবেচনা করে সরকার সিদ্ধান্ত নিবে এ বিষয়ে। সরকার বিবেচনা করে দেখে যে কখন দেওয়া যাবে, কীভাবে দেওয়া যাবে, কত শতাংশ দিবে...এর সাথে কমিশনের কোনো সম্পর্ক নাই,"তিনি বলেন।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:
সরকারি চাকরিজীবীরা কী বলছেন
সরকারি চাকরিজীবীদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে তা তাদের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি আনবে।
তবে, তাদের অনেকেই চান, এই পে-স্কেল তিন ধাপে নয়, এক ধাপে বাস্তবায়ন করা হোক।
বর্তমানে যশোরে কর্মরত বাংলাদেশের এক সরকারি কর্মকর্তা মো. কাউসার আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "সরকার চিন্তা করছে যে এই পে স্কেলে শতভাগ বেতন বৃদ্ধি করা হবে। কিন্তু এই বছর পাবে মূল বেতনের অর্ধেক, পরের বছরে বাকি অর্ধেক, এর পরের বছর পাবে ভাতার বর্ধিতাংশ। এভাবে বাড়ালে একপ্রকার ক্ষতি আমাদের। কারণ এই বছর যে ইনফ্ল্যাশন হয়েছে (পণ্যের ও সেবার দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যাওয়া), সামনের বছর এটা একই থাকবে, তা তো না। সেক্ষেত্রে এই বছরের ১০০ শতাংশ আগামী বছর হয়তো ৮০ শতাংশে নেমে আসবে।"
সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এর আগে অষ্টম পে স্কেল দেওয়া হয়েছিলো ২০১৫ সালে।
সেই সময়ে সরকারি কর্মচারীদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছিল এবং সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাতিল করে নতুন নিয়মে ইনক্রিমেন্ট চালু করা হয়েছিল।
মাঝে এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে এবং এই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম, চিকিৎসা খরচ, বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত ভাড়া কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সেই অষ্টম পে স্কেল প্রসঙ্গেই মি. আহমেদ আক্ষেপ নিয়ে বলেন, "এই ১১ বছরে টাকার মূল্য কমতে কমতে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে...২০১৫ সালে যে বাসা ১০ হাজার টাকায় ভাড়া পাওয়া যেত, এই ২০২৬ সালে সেই বাসা ২৫ হাজার টাকাতেও ভাড়া পাচ্ছে না। বেতন তো একই রয়েছে। প্রতিবছর যে পাঁচ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট হচ্ছে, তা আহামরি ধর্তব্য কিছু না।"
'গণকর্মচারীরা তিন ধাপে চাইবে না'
নবম পে স্কেল নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত ও সরকারি চাকরিজীবীদের দাবি নিয়ে বিবিসি বাংলা'র সাথে কথা হয় সাবেক সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খানের সাথে।
তিনি বলছিলেন, এমন কোনো লিখিত বা অলিখিত নিয়ম নেই যে পাঁচ বছর বা ১০ বছর পর পর পে স্কেল দিতে হবে। সেজন্যই স্বাধীনতার পর থেকে এই পর্যন্ত মাত্র আটটি পে-স্কেল হয়েছে।
কিন্তু, "অষ্টম পে-স্কেলের সময় সরকারের কাছে দাবি করেছিলাম আমরা যে বারবার পে স্কেল বদলানোর দরকার নাই। এর থেকে বরং যেটা ইনফ্ল্যাশন হবে, সেটির সাথে পে এডজাস্ট করে ফেলেন প্রতিবছর। সরকার তার সাথে একমত হয়। কিন্তু ইনফ্ল্যাশনের সাথে এডজাস্ট না করে তারা পাঁচ শতাংশ বাড়িয়েছে। যার কারণে ইনফ্ল্যাশন যতটুকু হয়েছে, তার চেয়ে বেতন কম বেড়েছে। তাই, এখন পে স্কেলের মাধ্যমে বেতন বাড়ানোর জন্য এবার আন্দোলন হলো।"
"কোনো সুপারিশ-ই কখনোই শতভাগ বাস্তবায়িত হয় না। তাই, অন্তর্বর্তী সরকার যে সুপারিশ দিয়ে গেছে, সেটিও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে না হয়তো। কিন্তু গণকর্মচারীরা চাইবেন, সুপারিশের যতটুকু বাস্তবায়িত করবেন, একবারে করেন। তারা তিন ধাপে চাইবে না।"
কারণ "তিন বছর পরে বাড়ালে আবার এক ভেজাল...সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতি করেন, ঘুষ খান...আমরা এরকম অনেক কথা বলতে পারি। কিন্তু যারা খান না, অধিকাংশ মানুষ দুর্নীতি করার সুযোগও পান না, তাদের জন্য তো এটা বাস্তবতা যে তাদেরকে রাষ্ট্র-জনগণ যে বেতন ভাতা এখন দিচ্ছে, তা তাদের জন্য যথেষ্ট না। তাই, তারা এটা একবারেই চাইবে।"
তবে এটিও ঠিক যে পুরো পে-স্কেল একবারে বাস্তবায়ন করলে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এজন্য ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা করা হচ্ছে।