এলপিজির অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে বাড়তি চাপ রান্নাঘরে

চলতি বছরের শুরু থেকেই এলপিজি নিয়ে ভোগান্তিতে সাধারণ গ্রাহকরা (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চলতি বছরের শুরু থেকেই এলপিজি নিয়ে ভোগান্তিতে সাধারণ গ্রাহকরা (ফাইল ছবি)
    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন, অবৈধ মজুদ ঠেকাতে অভিযান- বাংলাদেশে জ্বালানি তেল নিয়ে নানা তেলেসমাতি কর্মকাণ্ড কয়েকদিন ধরেই সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। এবার জ্বালানি নিয়ে এই অস্থিরতার প্রভাব পৌঁছালো সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেও।

এমন পরিস্থিতিতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দাম এক ধাক্কায় কেজি প্রতি প্রায় ৩৩ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি।

অর্থাৎ বাসাবাড়ি কিংবা ছোট রেস্তোরাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত- ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারে এখন ৩৮৭ টাকা বাড়তি ব্যয় করতে হবে।

অবশ্য এলপিজির দাম বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখন দেওয়া হলেও অন্তত চার মাস আগে থেকেই খুচরা বাজারে বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে ভোক্তাদের।

"ঘোষণা দিয়ে লাভ কী? দাম তো আগে থেকেই বেশি। গত মাসেই গ্যাস কিনেছি আঠারশো টাকা দিয়ে, তার আগের মাসে চব্বিশ'শো টাকায়," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ঢাকার আফতার নগর এলকার বাসিন্দা পারভেজ হাসান।

আগে থেকেই বাড়তি দামে সিলিন্ডার গ্যাস কেনার অভিযোগ রয়েছে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ মোর্তুজার।

"ফেব্রুয়ারি মাসে তো গ্যাসই পাচ্ছিলাম না, পরে দুই হাজার টাকায় একটা ম্যানেজ করছিলাম। এই মাসেও আঠারশো টাকা দিয়ে কিনছি," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি অবশ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং জাহাজে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণেই সিলিন্ডার গ্যাসের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

তবে গণশুনানি ছাড়াই এলপিজির দাম বৃদ্ধিকে বিইআরসির সেচ্ছাচারিতা হিসেবেই দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অনেকে।

তারা বলছেন, যুদ্ধ কিংবা বৈশ্বিক যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতির কারণে আমদানি পণ্যের দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু কতটুকু বাড়বে বা কমবে সেই সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হওয়া জরুরি।

"গণশুনানি পরিহার করে তারা নিজে নিজে ঘরে বসে দাম নির্ধারণ করছে। ব্যবসায়িরা এর আগেও তাদের নিজেদের মতো করে দাম বাড়িয়ে নিয়েছিল," বিবিসি বাংলাকে বলেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম।

এলপিজির দাম বৃদ্ধির কারণে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এলপিজির দাম বৃদ্ধির কারণে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে

দাম সমন্বয় কেন প্রয়োজন হলো

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। যার ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিনিয়তই বাড়ছে জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের দাম।

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে, এমন শঙ্কা আগে থেকেই করছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

এখনও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা না হলেও পেট্রোল পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ লাইনসহ এ নিয়ে নানা অস্থিরতা এরইমধ্যে শুরু হয়েছে।

কিন্তু সবচেয়ে আগে দাম বাড়লো প্রায় শতভাগ আমদানি নির্ভর এলপিজির। বৃহস্পতিবার এলপিজির দাম কেজি প্রতি ৩২ দশমিক ২৫ টাকা বাড়িয়ে মূল্য সমন্বয়ের বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বিইআরসি।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ভোক্তা পর্যায়ে এখন থেকে প্রতি কেজি এলপিজি ১৪০ দশমিক ২৯ টাকায় বিক্রি হবে। গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি বিইআরসির সবশেষ ঘোষণায় যা ১০৮ দশমিক ০৪ টাকা ছিল।

অর্থাৎ খুচরা পর্যায়ে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৩৪১ টাকা থেকে বেড়ে এখন থেকে এক হাজার ৭২৮ টাকায় বিক্রি হবে।

নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সংবাদ সম্মেলন জানিয়েছেন, বৈশ্বিক দাম বৃদ্ধির কারণেই বাংলাদেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করতে হয়েছে। এছাড়া জাহাজের প্রাপ্যতা এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও সামনে আনেন তিনি।

মূলত সৌদি আরবের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি- আরামকো নির্ধারিত দামকেই বাংলাদেশে এলপিজির দামের বেঞ্চমার্ক হিসেবে মনে করা হয়। এক্ষেত্রে সেখানে দাম বৃদ্ধির বা কমার প্রভাব পড়ে ঢাকায়ও।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর সভাপতি আমিরুল হক জানান, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক মূল্য বা সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস এপ্রিলের শুরুতেই গত মাসের তুলনায় চার শতাংশের মতো বেড়েছে।

"এনার্জি প্রাইস আমাদের হাতে থাকে না, এটা ডিসাইড করে আন্তর্জাতিক বাজার। আমরা দেশে এলপিজি আমদানি করি, প্রতি মাসের শেষ কার্যদিবসে এর দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মিল রেখে ঘোষণা করে বিএআরসি," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

যদিও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। বিশেষ করে দাম সমন্বয়ের আগে গণশুনানির আয়োজন না করাকে আইনবহির্ভূত হিসেবেই দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম।

সব পক্ষের অংশগ্রহণে গণশুনানি না করে দাম নির্ধারণের কারণে সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে না বলেই মনে করেন মি. আলম।

"জ্বালানির দাম সমন্বয়ের আগে গণশুনানি না করায় ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার আইনি দায়িত্ব পালন করছে না বিইআরসি। যার ফলে এই খাতে লুটপাটের যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে সেটিকেই মজবুত করছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

উল্লেখ্য, জ্বালানির দাম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বিইআরসি, আমদানিকারক, বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তাসহ অংশীজনদের নিয়ে একটি গণশুনানি করার কথা। যেখানে সব পক্ষের মতামত নেওয়া এবং তথ্য যাচাইবাছাই করা হয়।

কিন্তু ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আইন সংশোধন করে 'বিশেষ পরিস্থিতিতে' বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম সরাসরি নির্বাহী আদেশে বাড়ানোর ক্ষমতা নেয় সরকার। এরপর থেকেই গণশুনানির প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে

সংকটের শঙ্কা কতটা?

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেই এলপিজি নিয়ে ভোগান্তিতে সাধারণ গ্রাহকরা। তখন থেকেই বাড়তি দামে গ্যাস কেনার অভিযোগ রয়েছে অনেকের।

যার কারণ হিসেবে জাহাজ সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিকে দায়ী করেছিল বিইআরসি। যদিও কারসাজির অভিযোগ তুলেছিলেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশে আবারও জ্বালানি নিয়ে সংকটের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কদিন আগেই দেশের খুচরা বাজারে এলপিজি নিয়ে বিরূপ অভিজ্ঞতার পর এবার হঠাৎ করেই এর অতিরিক্ত দাম বৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে।

যদিও সরকার বলছে, জ্বালানি সংকটের কোনো শঙ্কা এখনও নেই। বিশেষ করে এলপিজি আমদানি এখনও স্বাভাবিক রয়েছে বলেই জানালেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।

তিনি বলছেন, বাংলাদেশে প্রতি মাসে এক লক্ষ ২০ হাজার থেকে এক লক্ষ ৩০ হাজার টন এলপিজির ব্যবহার হয়। গত বছর ১৪ লক্ষ ৬৫ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

"আগের বছরের তুলনায় এবছরের ফেব্রুয়ারি এবং মার্চে আমদানির পরিমাণ ভালো। এপ্রিল মাস নিয়ে আমদানিকারকরা একটু শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আমাদের কাছে বিশেষ করে পরিবহন জাহাজ নিয়ে," বলেন মি. আহমেদ।

সংকটের কোনো শঙ্কা নেই বলেই মনে করেন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর সভাপতি আমিরুল হক।

তিনি জানান, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রতি মাসে এলপিজি আমদানি বেড়েছে। এপ্রিল মাসে গ্যাস আরও বেশি আসবে বলেও জানান তিনি।

"যুদ্ধের কারণে আমরা অন্য রাস্তা বেছে নিচ্ছি। আমাদের মেম্বাররা এখন সব কার্গো আর্জেন্টিনা, মালয়েশিয়া, আমেরিকা থেকে আনছি।"

যদিও বিকল্প উৎস থেকে আনার কারণে পরিবহন খরচ বাড়তে পারে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। যার প্রভাব খুচরা বাজারে দামের ওপর পড়বে বলেই মত তাদের।