'মুসলিম বলে থানায় নিয়ে মার'- দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুইজন নারী সাংবাদিকের

সাকেত পুলিশ স্টেশনে শাহীনের করা একটি ভিডিও থেকে গোটা ঘটনা জানা যায়।
ছবির ক্যাপশান, সাংবাদিক শাহীন খান অভিযোগ করেছেন যে দিল্লি পুলিশ তার ওপর হামলা চালিয়েছেন
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

দিল্লির পুলিশ দুই জন নারী সাংবাদিককে থানায় নিয়ে গিয়ে মারধর করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা দুইজনই মুসলমান এবং তাদের ধর্মীয় পরিচয় জিজ্ঞাসা করে অত্যাচার করেছে পুলিশ- এমনই অভিযোগ করেছেন ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম '৪পিএম' -এ কর্মরত দুই নারী সাংবাদিক।

বৃহস্পতিবার রাত থেকেই অভিযোগকারী দুই জন সাংবাদিকদের একজনের রেকর্ড করা ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেছে।

সাংবাদিক সাহিন খান ও নাফিজা খান অভিযোগ করেন যে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তকে প্রশ্ন করায় তাদের ধর্ম চিহ্নিত করে দিল্লির সাকেত পুলিশ স্টেশনে তাদের হেনস্থা করা হয়। তারা সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও করে পুলিশের কথিত অত্যাচারের প্রমাণ স্বরূপ তাদের শরীরে লাঠির দাগ দেখান।

এরপরেই সাকেত পুলিশ স্টেশনে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখায়। তাদের দাবি গোটা ঘটনায় এফআইআর দায়ের করতে অস্বীকার করছে পুলিশ।

প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়াও এই ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দিয়েছে।

নারী সাংবাদিকদের আনা অভিযোগের বিষয়ে দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। দিল্লি পুলিশের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য বিবিসি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তাদের জবাব পাওয়া যায়নি।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা বসে আছেন, পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কালো পোশাক পরা একজন নারী সাংবাদিক যার হাতে কথা বলার বুম। পেছনে সাদা শার্ট পরা একজন দাঁড়ানো
ছবির ক্যাপশান, শাহীন জানান তিনি সাকেতে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর অনুষ্ঠানস্থল থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ভিডিওতে একটি প্রশ্ন করেছিলেন

কী অভিযোগ?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার উপস্থিতিতে সাকেতে একটি হাসপাতালের নতুন ভবন উদ্বোধনের সময়ে ঘটনার সূত্রপাত। সেখানেই এই দুই সাংবাদিককে পুলিশ হেনস্থা করে বলে অভিযোগ। তারপর তাদের জোড় করে সাকেত থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

গোটা ঘটনাটি প্রাথমিকভাবে সামাজিক মাধ্যমে সাংবাদিক শাহীন খানের করা একটি ভিডিও থেকে জানা যায়, যেখানে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, পুলিশ তাকে ও তার সহকর্মীকে হেনস্তা করেছে।

দিল্লি পুলিশের কাছে দায়ের করা এক অভিযোগে শাহীন খান জানিয়েছেন যে, সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ তিনি দেখেন এলাকাটি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন; খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন যে রেখা গুপ্তা এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ম্যাক্স হাসপাতালের একটি নতুন ভবনের উদ্বোধনে আসছেন, আর সে কারণেই এই পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হয়েছিল।

মিস শাহীন জানান যে, তিনি ও তার সহকর্মী নাফিসা খান অনুষ্ঠানস্থল থেকে বেশ কিছুটা দূরে ছিলেন। তারা মুখ্যমন্ত্রীর একটি কাট-আউটের সামনে দাঁড়িয়ে একটি ভিডিও করেন যেখানে তিনি বলেন যে, এলাকাটি সাধারণত এতটা পরিষ্কার থাকে না। এমনকি থানা ও হাসপাতালের বাইরেও যেখানে প্রায়শই আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়, সেখানে কেন ভিআইপি-র আগমন উপলক্ষে এমন পরিপাটি ও ঝকঝকে পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে?

অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, "ঠিক তখনই কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা পেছন থেকে এগিয়ে আসেন এবং হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি আমাদের ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। আমি যখন ক্যামেরার সামনে এর প্রতিবাদ জানাই, তখন কয়েকজন নারী পুলিশ সদস্যকে সেখানে ডাকা হয়।"

এই ভিডিওতে শাহীন খান দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, "আমাকে চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করার পর তারা এখন আমার নাম জানতে চাইছে।"

তিনি বলেন, "মুখ্যমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার শাস্তি হিসেবেই দিল্লি পুলিশ আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছে।"

প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়া তাদের দেওয়া বিবৃতিতে দাবি করেছে, থানায় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার ওই দুই নারী সাংবাদিককে একটি ঘরে নিয়ে যেতে বলেন যেখানে নারী পুলিশ অফিসাররাও উপস্থিত ছিলেন। তারপর ওই দুজন নারী সাংবাদিককে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ।

ওই সাংবাদিকরা এও অভিযোগ করেছেন যে তাদের ধর্ম জেনে তাদের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে এবং অশ্রাব্য ভাষায় কটূক্তিও করা হয়েছে।

নাফিসা খান সংবাদমাধ্যমকে জানান, "যাদের সুরক্ষা দেওয়ার কথা তারাই অত্যাচার করছে। এবং ধর্ম জিজ্ঞাসা করে অত্যাচারের পরিমাণ বাড়ছে। আমি মুসলিম এটা জানার পর ওরা আমাদের আরও বেশি মারধর করতে শুরু করে। আমাদের যখন পুলিশ মারছিল, এসএইচও (স্টেশন হাউস অফিসার) বসে বসে তখন হাসছিল।"

তিনি এও জানান যে তাদের বলা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে এমন আইনি ধারা দেওয়া হবে যা তাদের কল্পনাতীত।

এমনকি সহকারী পুলিশ কমিশনারের কাছে সাহায্য চেয়েও তারা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন শাহীন খান।

তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, থানায় চিকিৎসা সহায়তা চেয়েও তা পাননি। ১১২ নম্বরে ফোন করার পর তিনি সহায়তা পান।

তবে এ ব্যাপারে বিবিসি এখনো স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য যাচাই করতে পারেনি।

দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে তারা
ছবির ক্যাপশান, গোটা ঘটনার নিন্দা করেছে প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়া

তদন্তের দাবি প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ার

দুইজন নারী সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান উইমেনস প্রেস কোর, দিল্লি ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টস, প্রেস অ্যাসোসিয়েশন এবং কেরালা ইউনিয়ন অফ ওয়ার্কিং জার্নালিস্টস একটি যৌথ বিবৃতি জারি করেছে।

প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়া দিল্লি পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমারকে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য আবেদন জানিয়েছে। যে সব পুলিশ কর্মকর্তারা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থার আবেদনও জানিয়েছে তারা। পাশাপাশি তারা প্রেস কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়াকে গোটা ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করে স্বাধীনভাবে তদন্তের আর্জিও জানিয়েছে।

'ফোর পিএম নিউজ নেটওয়ার্ক' তাদের এক্স হ্যান্ডেলে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছে যে অভিযোগকারীদের পাশে তারা আছে। পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে, এ বিষয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছেও একটি চিঠি লেখা হয়েছে।

তেসরা সেপ্টেম্বর রাতে, এই ঘটনায় এফআইআর দায়ের করার দাবিতে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক সাকেত থানার বাইরে জড়ো হন। অনেক সাংবাদিকও এই ঘটনার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

ইংরেজি সংবাদপত্র 'দ্য হিন্দু'-র কূটনীতি বিষয়ক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার লিখেছেন, "এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আশা করি, দিল্লি পুলিশ শিগগিরই বিষয়টির দিকে নজর দেবে।"

সাংবাদিক ও ইউটিউবার অজিত আঞ্জুম লিখেছেন, "শাহীন ও নাফিসার ওপর যারা চড়াও হয়ে মারধর করেছে, তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করতে হবে। দিল্লি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখনো কেন কোনো পদক্ষেপ নেননি? একজন সাংবাদিকের সঙ্গে যদি এমন আচরণ করা হতে পারে, তবে সাধারণ মানুষকে কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে?"

নেহা বোরা - ফাইল ছবি
ছবির ক্যাপশান, আইসা নেত্রী নেহা বোরা সাকেত পুলিশ স্টেশনে বিক্ষোভ দেখান

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে এই ঘটনা। আম আদমি পার্টির (আপ) নেতারা সাংবাদিকদের ওপর কথিত বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়েছেন। নারী সুরক্ষা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

আম আদমি পার্টি তাদের এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছে, "প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নিজস্ব 'ফোর-ইঞ্জিন সরকার'-এর মুখ্যমন্ত্রী, যিনি নারী ক্ষমতায়নের প্রতি নিজের অঙ্গীকারের কথা জোর গলায় প্রচার করেন, তিনি আসলে কী করছেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীনে থাকা পুলিশ এক নারী সাংবাদিককে নির্মমভাবে মারধর করেছে, কারণ তিনি কেবল মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাকে প্রশ্ন করছিলেন। এই পরিস্থিতিতে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন উঠে আসে- মোদী সরকারের আমলে কি এভাবেই সবসময় নারীদের কণ্ঠস্বর দাবিয়ে রাখা হবে?"

সাকেত থানার সামনে গিয়ে ধর্নায় বসে সিপিআই-এমএল-এর ছাত্র সংগঠন আইসা এবং এর সদস্যরা স্লোগান দিতে থাকেন।

আইসা নেত্রী নেহা বোরা বলেন, "মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা কি অপরাধ? যে কারণে নাফিসা ও শাহীনকে পুলিশ থানায় নিয়ে এলো, তার থেকেও বড় প্রশ্ন এদের ধর্ম জিজ্ঞাসা করে মারধর করা হলো, সংবিধান কি সেই অধিকার দেয়? সংবিধান সমানাধিকারের কথা বলে। এই ঘটনা আমাদের দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে তেমনই পুলিশের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। যদি তারা রক্ষক না হয়ে ভক্ষক হয়ে ওঠে তবে তাদের সমাজে কী প্রয়োজন?"

তিনি সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট করেছেন, "সত্য তুলে ধরার কারণে দুই মুসলিম সাংবাদিকের ওপর এটি একটি সাম্প্রদায়িক হামলা ছাড়া আর কিছুই নয়।"

কংগ্রেস নেতা পবন খেরা এক্স-এ লিখেছেন, "দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে প্রশ্ন করায় নারী সাংবাদিকদের মারধর ও আহত করা হচ্ছে। আর পুলিশ যখন জানতে পারে যে ওই সাংবাদিকদের মধ্যে একজন মুসলিম, তখন সেই হামলা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। একে কি গণতন্ত্র বলা যায়—নাকি এটি একটি পুলিশি রাষ্ট্র?"

অভিযোগকারী সাংবাদিকরা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এবং 'মেডিকো-লিগাল কেস' (এমএলসি) রিপোর্টের মাধ্যমে তাদের আঘাতের বিষয়টি নথিবদ্ধ করার জন্য এইমস-এ গিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে।