হরমুজ থেকে মালাক্কা, যে পাঁচ সরু সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল বিশ্বের বাণিজ্য

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শিল্প উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী অ্যালুমিনিয়ামের মতো কাঁচামালের বণ্টনও যুদ্ধের কারণে প্রভাবিত হয়েছে
পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও কাঁচামালের বাজার ব্যাহত হয়েছে। যুদ্ধের একপর্যায়ে ইরান তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল।

সেই সাথে গত দুই সপ্তাহে এই সমুদ্রপথ পার হতে চেষ্টা করা এক ডজনেরও বেশি জাহাজে হামলা করেছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রণালি নিরাপদ করার জন্য তার ইউরোপিয় মিত্রদের চাপ দিয়েছেন।

তিনি সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে সমর্থন না করলে তা "নেটোর ভবিষ্যতের জন্য খুবই খারাপ" হবে।

পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচলে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় ব্রেন্ট (অপরিশোধিত) তেলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগে যা ছিল প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলার, সেটি আরো বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

এর ফলে ভোক্তাপণ্য থেকে শুরু করে কৃষিসংক্রান্ত কাঁচামালসহ আরও নানা ধরনের পণ্যের বিশ্ব বাণিজ্যও প্রভাবিত হয়েছে।

কিন্তু এই যুদ্ধ আরও একটি বড় সমস্যাকে সবার সামনে নিয়ে এসেছে।

সেটি হলো, আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বিশ্ব বাণিজ্য অল্প কিছু সরু সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলোকে প্রায়ই সামুদ্রিক "বটলনেকস বা চলাচলের সরু পথ" বলা হয়ে থাকে।

নিচে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো সম্পর্কে এবং সেগুলো বাধাগ্রস্ত হলে সম্ভাব্য কী ধরনের ঝুঁকি হতে পারে সে বিবরণ তুলে ধরা হলো।

হরমুজ প্রণালি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জ্বালানি পথ হলো হরমুজ প্রণালি

হরমুজ প্রণালি

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জ্বালানি পথ হলো হরমুজ প্রণালি।

এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে।

সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৯ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৯ শতাংশ এই পথ দিয়েই যায়।

বাণিজ্যের অন্যান্য বটলনেকস বা চলাচলের সরু পথগুলোর তুলনায় এই হরমুজ প্রণালির বৈশিষ্ট্য হলো, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির জন্য বাস্তবিকভাবেই এই পথটির কোনো বিকল্প নেই।

১৯৮০ সাল থেকেই ইরান মাঝে মাঝেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে।

তবে গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম ইরানের ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালানোর পর জাহাজ চলাচলে যে বাধার সৃষ্টি হয়েছে, সেটি গত কয়েক দশকের মধ্যে উত্তেজনা যেভাবে বেড়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে এই যুদ্ধের কারণে, "বিশ্বের তেলের বাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিপর্যয় ঘটেছে" এবং বিশ্ববাজারে ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।

পারস্য উপসাগরে সামুদ্রিক পরিবহনে এই বাধার প্রভাব জ্বালানি খাতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।

এই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে বছরে ২৬ মিলিয়ন বা দুই কোটি ৬০ লাখের বেশি কন্টেইনার যাতায়াত করে এবং বিশ্বের সার রপ্তানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই যায় পরিবহন করা হয়।

এই কারণেই সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে দীর্ঘমেয়াদী বাধা বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন খরচের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

হরমুজ প্রণালি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও চাহিদায় গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে

সুয়েজ খাল

লোহিত সাগরকে ভূমধ্যসাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে সুয়েজ খাল। যেটি এশিয়া এবং ইউরোপের ভ্রমণের সময় অন্তত ১০ দিন কমিয়ে দিয়েছে।

বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১০ শতাংশই এই জলপথ দিয়ে হয়।

এর মধ্যে রয়েছে মোট কন্টেইনার পরিবহনের ২২ শতাংশ, যানবাহন চলাচলের ২০ শতাংশ এবং ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের ১০ শতাংশ।

যেহেতু এই সুয়েজ খাল মিশরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেহেতু এটি সহজে বা সরাসরি কোনো হুমকির সম্মুখীন হয় না।

তবে এই জলপথটি যে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয় তা ২০২১ সালে একটি বড় জাহাজ আটকে যাওয়ার ঘটনায় প্রমাণিত হয়।

ওই জাহাজটি আটকে যাওয়ায় ছয় দিন সরু এই সুয়েজ খালটি বন্ধ ছিল। এর ফলে প্রায় ১০ বিলিয়ন বা এক হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই কৌশলগত খালটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বাবে আল মানদাব প্রণালি।

গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিবাদে ২০২৩ এবং ২০২৫ সালের মধ্যে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী হুথিরা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে যে হামলা চালিয়েছিল তার ফলে অনেক জাহাজ পথ পরিবর্তন করে আফ্রিকা হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।

এই কারণে সুয়েজ খালে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা যেটি ২০২৩ সালে ২৬ হাজারের বেশি ছিল তা কমে পরের বছর ২০২৪ সালে ১৩ হাজারে নেমে দাঁড়িয়েছে।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ নিতে সম্প্রতি হুথি নেতারা আবারো বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছে।

তারা সতর্ক করে বলেছে, তাদের "আঙ্গুল (বন্দুকের) ট্রিগারে রয়েছে।"

পানামা খাল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রশান্ত এবং আটলান্টিক সাগরকে সংযুক্ত করেছে পানামা খাল

পানামা খাল

বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে প্রশান্ত এবং আটলান্টিক সাগরকে সংযুক্তকারী পানামা খাল।

এই দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ তুলনামূলকভাবে কম মনে হলেও কন্টেইনারজাত পণ্য, গাড়ি এবং শস্যের মতো উচ্চমূল্যের কার্গো এবং কৌশলগত পণ্য এই খাল বা সমুদ্রপথ দিয়ে বেশি পরিবহন করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মোট কন্টেইনার কার্গোবাহী পণ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ এই সুয়েজ খাল দিয়ে পরিবহন করা হয়, যার বার্ষিক মূল্য ২৭০ বিলিয়ন ডলার।

এই খালের দুর্বলতা মূলত জলবায়ু পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক ইস্যু উভয় বিষয়ের সাথেই সংযুক্ত।

২০২৩ সালে এবং ২০২৪ সালে তীব্র খরা শুরু হলে খালের মিঠা পানির জলাধারগুলোতে পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, ফলে জাহাজের সংখ্যা এবং আকার সীমিত করতে বাধ্য হয় মিশরীয় কর্তৃপক্ষ।

এরপর ২০২৫ সালের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খালটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দেন।

এই খালের কিছু বন্দর হংকংভিত্তিক হাচিসন কোম্পানি পরিচালনা করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ট্রাম্প।

মালাক্কা প্রণালি

ছবির উৎস, Thierry Dosogne via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মালাক্কা প্রণালি বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রপথ

মালাক্কা প্রণালি

মালাক্কা প্রণালি বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রপথ। বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ২৪ শতাংশ এই সমুদ্রপথ দিয়ে হয়।

এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রপথে পরিবাহিত ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের ১০ শতাংশ এবং অটোমোবাইল বাণিজ্যের ২৬ শতাংশ।

সিঙ্গাপুরের পাশে দিয়ে গেছে এই মালাক্কা প্রণালি। যেটি বিশ্বের দ্বিতীয় ব্যস্ততম কন্টেইনার পোর্ট বা বন্দর।

চীন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানির জন্য একটি প্রধান গেটওয়ে বা প্রবেশপথ এই মালাক্কা প্রণালি।

চীনের তেল আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই এই পথ দিয়ে আসে।

এই নির্ভরশীলতাকে "মালাক্কা ডিলেমা বা দ্বিধা বা উভয়সঙ্কট" হিসেবে উল্লেখ করে বেইজিং।

পাইরেসি এখনো একটি কন্সট্যান্ট কনসার্ন বা অবিরাম উদ্বেগ হিসেবে রয়েছে।

২০২৫ সালে এই মালাক্কা প্রণালিতে ১৩০টিরও বেশি জলদস্যুতার ঘটনা ঘটেছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ইস্যু।

এই অঞ্চলে সামুদ্রিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মধ্যে যে কোন ধরনের উত্তেজনা বাড়লে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

এছাড়া সুনামি এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে এই মালাক্কা প্রণালি।

উদাহরণস্বরূপ, ২০০৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বরের সুনামিতে এই প্রণালির দক্ষিণ প্রবেশপথের উপকূলীয় অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল।

তুরস্কের ইস্তাম্বুলের কন্টেইনার বন্দর

ছবির উৎস, Westend61 via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কৃষ্ণ সাগর এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যে একমাত্র সমুদ্রপথ হলো তুরস্কের বসফোরাস এবং দার্দেনেলিস প্রণালি।

তার্কিশ প্রণালি/ টার্কিশ প্রণালি

কৃষ্ণ সাগর এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যে একমাত্র সমুদ্রপথ হলো তুরস্কের বসফোরাস এবং দার্দেনেলিস প্রণালি।

বিশ্বের সমুদ্র পরিবাহিত বাণিজ্যের তিন শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।

তবে এই পরিমাণ সামান্য মনে হলেও এই প্রণালির মাধ্যমেই ইউক্রেন, রাশিয়া এবং রোমানিয়া থেকে বিশ্বের মোট গম রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়।

এই প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশ ৭০০ মিটার চওড়া, এই রুট তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে।

এ কারণে এখানে জাহাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা এখানে সাধারণ বিষয়।

মন্ট্রেক্স কনভেনশন অনুযায়ী, এই প্রণালিগুলোতে প্রবেশাধিকার সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তুরস্ক।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে আঙ্কারা এই ক্ষমতা ব্যবহার করে যুদ্ধজাহাজ চলাচল সীমিত করেছে তবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ খোলা রেখেছে।

কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এই ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং বিশ্বব্যাপী শস্যের বাজারে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

একইসাথে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকিও এই অঞ্চলে আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকট বৈশ্বিক বাণিজ্যের চরম এই ঝুঁকি প্রকাশ করেছে যে, বিশ্ববাণিজ্য মাত্র অল্প কয়েকটি সরু জলপথের ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু বর্ণিত পাঁচটি সমুদ্রপথই যে বাণিজ্যের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বিষয়টি এমন নয়।

পুরো বিশ্বে এমন অন্তত ২৪টি কৌশলগত সামুদ্রিক পয়েন্ট বা সমুদ্রপথ রয়েছে। এর মধ্যে তাইওয়ান, ডোভার এবং বেরিং প্রণালির মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অন্তর্ভুক্ত।

এই জলপথগুলোর প্রত্যেকটিই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, জলবায়ু পরিবর্তন, পাইরেসি বা জলদস্যুতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনার মতো কোনো না কোনো নির্দিষ্ট ঝুঁকির মুখে রয়েছে।