বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতিতে কী পরিবর্তন করতে চাইছে সরকার?

    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশে পাবলিক পরীক্ষায় যে কোনো বিষয় পুনঃনিরীক্ষণ করার আবেদন বা অনুত্তীর্ণ হলে সর্বোচ্চ চারবার পরীক্ষা দেওয়ার যে বর্তমান নিয়ম রয়েছে, সেটি পরিবর্তনের কথা ভাবছে সরকার।

একইসাথে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ, পরীক্ষার হলে প্রযুক্তিগত অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বর্তমান আইনেই পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী।

এরই অংশ হিসেবে, আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালা এবং দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) অ্যাক্ট, ১৯৮০, তে বেশ কিছু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন শনিবার রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরী শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার কেন্দ্রের সচিবদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় বিদ্যমান আইনে এমন কিছু পরিবর্তন করার কথা জানান।

এছাড়া, সারাদেশের সব শিক্ষাবোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরিবর্তন আনার কথাও চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মি. মিলন।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, "প্রশ্নপত্র ফাঁস আউটের সাথে কে রিলেটেড আমরা কী জানি না? তাদেরকেও আইনের আওতায় আমরা আনবো। আইন এমনভাবে স্টিপুলেট করবো, ছাত্রছাত্রীদের জন্য না, আমাদের জন্য।"

বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা।

কর্মকর্তারা বলছেন, পুনঃনিরীক্ষণ পদ্ধতির বদলে পুনর্মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা, ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে হওয়া জালিয়াতির জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যই বিদ্যমান আইনে বেশ কিছু সংস্কার, পরিবর্তন ও আইন যুগোপোযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইন কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ফাহিম ফয়সাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এরই মধ্যে বিদ্যমান আইনটিকে কিভাবে যুগোপোযোগী করা যায় সেটির প্রাথমিক খসড়া তৈরির কাজ চলছে।"

এদিকে, পাবলিক পরীক্ষায় পুনঃনিরীক্ষণ পদ্ধতি বাতিল করে পুনর্মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করলে সেটি 'খুবই খারাপ সিদ্ধান্ত হবে' উল্লেখ করে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষকরা।

অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মাজহারুল হান্নান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এটা খুবই খারাপ সিদ্ধান্ত হবে। পুনর্মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হলে দুর্নীতি আরো প্রচণ্ডভাবে বেড়ে যাবে। এর ফলে সুযোগটা সৃষ্টি হয়ে যাবে, করাপশন বা দুর্নীতি ঠেকানোর আর কোনো সুযোগ থাকবে না।"

পরীক্ষার খাতা পুনঃনিরীক্ষণের অর্থ কী?

বিভিন্ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা জানান, পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণ বলতে পুনর্মূল্যায়ন বোঝায় না।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালা অনুযায়ী, পরীক্ষার খাতায় বা উত্তরপত্রের ভেতরে কোনো প্রশ্নোত্তরে পরীক্ষক বা প্রধান পরীক্ষক মূল্যায়ন না করলে পুনঃনিরীক্ষণ পদ্ধতিতে বর্তমানে নম্বর দেওয়া যায়।

উত্তরপত্রের ভেতরে কোনো নম্বর কভার বা প্রথম পাতায় ওঠাতে ভুল হলে সেটি সংশোধন করা যাবে।

একইসাথে কভার পৃষ্ঠায় ওঠানো নম্বরের যোগফল ভুল হলে সেটিও সংশোধন করা যাবে।

কিন্তু বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী, পুনঃনিরীক্ষণ পদ্ধতিতে পরীক্ষক বা প্রধান পরীক্ষকের দেওয়া নম্বর কোনো অবস্থাতেই সংশোধন করা যায় না।

শিক্ষা বোর্ডগুলো পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সাত দিনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফিসহ পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদনপত্র গ্রহণ করে এই পদ্ধতিতে।

পরবর্তীতে যারা, যেসব বিষয়ে আবেদন করে তাদের রোল নম্বরগুলো পুনঃনিরীক্ষণ করা হয়।

পরে শিক্ষা বোর্ডগুলো আবেদন করা বিষয়ের উত্তরপত্র নিরীক্ষণ করে ফল প্রকাশ করে থাকে।

বিষয়টির ব্যাখ্যা করে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ ন ম মোফাখখারুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "গণনায় ভুল, বৃত্ত ভরাটে ভুল অথবা কোনো প্রশ্ন অমূল্যায়িত থেকে গেলে সেটিতে নম্বর দেওয়ার যে সুযোগ সেটিকেই পুনঃনিরীক্ষণ পদ্ধতি বলে।"

পুনর্মূল্যায়ন পদ্ধতি কী? এতে আপত্তি কেন?

বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, এরই মধ্যে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষামন্ত্রী বিভিন্ন বৈঠকে পুনর্মূল্যায়ন পদ্ধতির কথা জানিয়েছেন।

এই পদ্ধতিতে পরীক্ষার খাতাকে নতুন করে মূল্যায়ন করা বোঝায়।

অর্থাৎ এই পদ্ধতিতে নম্বর কমতে পারে, একই থাকতে পারে এবং বাড়তেও পারে।

পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করলে তিনটি সুযোগই পাবেন একজন পরীক্ষার্থী।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. শামছুল ইসলাম জানান, শিক্ষামন্ত্রী এই বিষয়ে কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে নীতিমালা বা আইনে পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত পুনঃনিরীক্ষণ পদ্ধতিই চালু থাকবে।

এদিকে, শিক্ষকরা যখন বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করেন তা বেশ নিরপেক্ষভাবেই করেন বলে দাবি করেন অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক মো. মাজহারুল হান্নান।

"শিক্ষকরা যখন খাতা দেখেন তখন সেটি বোঝা যায় না যে, সেটি কার খাতা, কোথাকার খাতা, কিসের খাতা। তার পরিচয় কিন্তু খাতায় গুপ্ত থাকে, কোড নম্বর হিসেবে থাকে" বলেন মি. হান্নান।

"সেজন্য এটা বোঝা যাবে না যে, কোন কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী, মেয়ে না ছেলে কোনোভাবেই পক্ষপাতিত্ব করার কোনো সুযোগ নেই" কথাগুলো বলছিলেন ৪০ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশায় থাকা এই নেতা।

মি. হান্নানের দাবি, "এটা খুবই নির্বুদ্ধিতার পরিচয় হবে। এই সুযোগ তৈরি হলে সমস্ত খাতা পুনর্মূল্যায়নের আবেদন হবে। সেক্ষেত্রে টাকা-পয়সার ছড়াছড়ি হবে, তাই এটা হতে দেওয়া কোনোমতেই উচিত না।"

'ফেইল করলে দুইবারের বেশি পরীক্ষা দেওয়া যাবে না'

শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, একজন শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে অনুত্তীর্ণ বা ফেইল করলে দুইবারের বেশি ওই বিষয়ে পরীক্ষা দিতে পারবেন না।

"একজন একবার ফেইল করলো, দুইবার ফেইল করলো, তিন বার ফেইল করলো, চারবার পর্যন্ত আপনারা রেজিস্ট্রেশন করে কোয়েশ্চেন করেন। আচ্ছা আপনার কী দায়িত্ব হয়ে গেছে ফেইলিওর স্টুডেন্টের লিগ্যাসি ক্যারি করা, এটা কি আমাদের দায়িত্ব? দুইটার বেশি সুযোগ পাবে না" বলেন মি. মিলন।

তবে শিক্ষক নেতা মো. মাজহারুল হান্নান মনে করেন, অনুত্তীর্ণ হওয়া পরীক্ষার্থীকে পড়াশোনা করেই আবার পরীক্ষায় বসতে হবে। তাই তাকে এই সুযোগ দেওয়াই যায়।

অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি মি. হান্নান বলেন, "এইক্ষেত্রে সুযোগ দেওয়া উচিত। যদি কোনো ছাত্র পড়তে চায়, পরীক্ষা আবার দিতে চায় তাহলে সেখানে বাধা দেওয়ার কী আছে। সে দিতে পারে।"

ডিজিটাল অপরাধ প্রতিরোধে আইনে সংশোধনী আনা হবে

দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস(অফেন্সেস)অ্যাক্ট, ১৯৮০, অনুযায়ী বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা যেমন: এসএসসি, এইচএসসি, বৃত্তি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইন কর্মকর্তা ফাহিম ফয়সাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "১৯৮০ সালের আইনটি দিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনলাইনে প্রশ্ন ফাঁস বা ডিজিটাল ফরম্যাটে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান ওই আইনে ছিল না।"

বর্তমান আইনের আওতায় ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে পরীক্ষায় জালিয়াতি, অসদুপায় অবলম্বন এবং অর্গানাইজড ক্রাইম বা অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।

"অর্গানাইজড ক্রাইম যেমন একটা সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী, অনেকে মিলে অপরাধ করলে প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা এবং কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোন কোচিং সেন্টারও যদি জড়িত থাকে তাদেরকে আইনের আওতায় আনার জন্যই কাজ চলছে" বলেন মি. ফয়সাল।

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে যেসব অপরাধ প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে করা হয়, সেগুলোকে বিদ্যমান আইনে শাস্তির আওতায় "কতটা অ্যাকোমোডেট করা যায় সেই চেষ্টাই চলছে" বলে জানান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই আইন কর্মকর্তা।

তবে, "এটি এখনো চূড়ান্ত নয়, এখনো খুব খসড়া পর্যায়ের কাজ চলছে। এটা নিয়ে আইন কমিশনও একটা কাজ করছে, সুপারিশ প্রণয়ন এই আইনটাকে কিভাবে যুগোপোযোগী করা যায়। সব মিলিয়ে এখনো খসড়া পর্যায়ে আছে" বলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইন কর্মকর্তা মি. ফয়সাল।