নারী ফুটবল: যেসব কারণে খুব অল্প বয়সে খেলা ছাড়েন বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা

ফুটবল, নারী
ছবির ক্যাপশান, মাত্র ২২ বছর বয়সে ফুটবল ছেড়ে রেফারি হয়ে ম্যাচ পরিচালনা করছেন জয়া চাকমা
    • Author, রায়হান মাসুদ
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

"আমি ছাড়িনি, বাধ্য হয়েছি," বলছিলেন ডালিয়া আক্তার, একসময় যিনি জাতীয় ফুটবল দলের নেতৃত্বও দিয়েছেন ।

মাত্র ২৫ বছর বয়সেই তিনি ফুটবল ছেড়ে দিয়ে শুরু করেন হ্যান্ডবল খেলা, আর এরপর কোচিং।

"শেষ যখন অধিনায়কত্ব করি তখন ইন্দো-বাংলা গেমসে আমরা চ্যাম্পিয়ন হই। এর ঠিক পরেই সাফ গেমসের জন্য যে ৩৮ জনের দল ঘোষণা করা হয়, সেখানে আমাকে ডাকাই হয়নি," জানান ডালিয়া আক্তার।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে অল্প বয়সেই ফুটবল ছেড়ে কোচিং, রেফারিং বা অন্য ক্রীড়ায় যোগ দেয়া নারীদের তালিকা বেশ লম্বা।

ভিডিওর ক্যাপশান, সাবিনা খাতুন: বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সাকিব?
  • অম্রাচিং মারমা - যিনি সাফ ফুটবলেও গোল করেছেন, ২৩ বছর বয়সে ফুটবল ছেড়েছেন।
  • সাবিনা - যিনি জাতীয় দলের নিয়মিত ফুটবলার। তবে জাতীয় দলের খেলা না থাকায় তিনি বাংলাদেশের বয়স-ভিত্তিক দলগুলোর সাথে সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করেছেন। তবে তাকে নতুনভাবে খেলোয়াড় হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে তাগাদা দিয়েছে বাফুফে।
  • জয়া চাকমা - ২৮ বছর বয়সের এই সাবেক নারী ফুটবলার বাংলাদেশ ও দেশের বাইরে রেফারির দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তিনি ফুটবল ছেড়েছেন ২০১২ সালে, অর্থাৎ মাত্র ২২ বছর বয়সে।

আরো পড়ুন:

ফুটবল, নারী
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন টার্ফে সাবিনা খাতুন
ফুটবল, নারী
ছবির ক্যাপশান, এই দলটি বাংলাদেশের অন্যতম সফল একটি বয়সভিত্তিক নারী ফুটবল দল

বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের ঝড়ে পড়ার তালিকা এমন লম্বা কেন?

ডালিয়া আক্তারের সাথে কথা বলে এর কিছু কারণ খুঁজে পাওয়া গেল।

তিনি জানান, বিগত দশ বছরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন শুধুমাত্র বয়স-ভিত্তিক ফুটবল দল নিয়ে কাজ করেছে।

নারীদের লিগ হওয়ার কথা থাকলেও তার কোনো ধারাবাহিকতা নেই।

ফুটবল, নারী
ছবির ক্যাপশান, তাহুরা খাতুন, গেলো ৫ বছরের বয়সভিত্তিক দলের অন্যতম সফল ফুটবলার

"খেলোয়াড়রা খেলা ছাড়ে না। তবে একটা ফুটবলার নিজেকে কতদিন কোনো লক্ষ্য ছাড়া উজ্জীবিত রাখবে?" প্রশ্ন রাখেন ডালিয়া আক্তার।

তিনি বলেন, একজন ফুটবলার যখন দেখেন কোনো লিগ নেই, কোনো আয়োজন নেই, তখন তিনি বিকল্প দেখতে বাধ্য হন।

গেলো ১০ বছরে জাতীয় পর্যায়ের চ্যাম্পিয়নশিপ হয়েছে মাত্র দু'বার।

ক্লাবগুলোও এখন আগ্রহ হারাচ্ছে

ডালিয়া আক্তার বলেন, যেহেতু খেলা নেই তাই ফুটবলারদের বসিয়ে রেখে বেতন দিতে হয় - যেটা শেষ পর্যন্ত ক্লাবগুলোর জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

"আমার কাছে মনে হয়, সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে শুধু বয়স-ভিত্তিক খেলা চালিয়ে যাওয়াটা অবান্তর," বলছিলেন তিনি।

"শুধু অনুর্ধ্ব ১৪ আর অনুর্ধ্ব ১৬তে সর্বোচ্চ ৪০ জন ফুটবলার রয়েছে, কিন্তু একটা দেশে ন্যুনতম চার হাজার থেকে ছয় হাজার ফুটবলার প্রয়োজন।"

ফুটবল, নারী
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশ ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ডালিয়া আক্তার পরবর্তীতে হ্যান্ডবলে চলে আসেন

ডালিয়া আক্তার মনে করেন, গ্রাম থেকে আসা একটা মেয়ের জন্য ১৮ বছর বয়স হওয়ার পর কোনো পেশাদার মঞ্চ ছাড়া ফুটবল চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

যার কারণে অনেক অভিভাবক ফুটবলারদের খেলা থেকে নিয়ে যায়, বলছেন তিনি।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের বক্তব্য কী

"আমাদের এই মুহূর্তে সিনিয়র দল নেই, এরাই সিনিয়র দল হবে, এখানে কিন্তু দু'বছর আগের ফুটবলাররা নেই, তারা এখন অনুর্ধ্ব ১৯-এ আছেন," বলছিলেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নারী উইংয়ের প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণ।

তবে এর আগেও তো ফুটবলার ছিলেন যারা খুব অল্প বয়সে খেলা ছেড়েছেন, তার কারণ কী?

এমন এক প্রশ্নে মাহফুজা আক্তার কিরণের উত্তর: "আমরা এই দলটিকে যে লেভেলে ট্রেনিং করাচ্ছি, আমরা এর আগে আর্থিক কারণে এইভাবে নিয়মিত ট্রেনিং করাতে পারিনি।"

ফুটবল, নারী
ছবির ক্যাপশান, গোলাম রব্বানী ছোটনের অধীনেই খেলছে বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক নারী দলগুলো

বাফুফের এই কর্মকর্তা বলেন, এখন কোচদের অধীনে ক্যাম্পে প্রতিদিন ন্যুনতম তিন থেকে চার বেলা অনুশীলন করানো হয় যেটার সাথে আগের ফুটবলাররা মানিয়ে নিতে পারে না।

"এখন যেমন ট্রেনিং হয় দিনে চার বেলা, এমন অনুশীলন আসলে আগের ফুটবলাররা করতে পারেন না, এই কষ্ট সবাই নিতে পারে না। তাদের আমরা ডেকেছিলাম, কিন্তু তারা চালিয়ে যেতে পারেনি।"

মাহফুজা আক্তার কিরণ বলেন, আবার অনেক ফুটবলার বিয়ে করে আর ফুটবল চালিয়ে যেতে পারেন না। "যেহেতু আমরা বাঙালি, বিয়েশাদীর ব্যাপারটা চলে আসে।"

"বয়সভিত্তিক আমাদের পুরুষ দলেও কোনো বেতনের ব্যবস্থা নেই, কিন্তু নারী দলের জন্য আমরা বেতন দিচ্ছি," পেশাদারিত্বের প্রশ্নে এমন উত্তর দেন মিজ কিরণ।

বিবিসি বাংলায় আরও খবর: