পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে এ-আই দিয়ে বুথে নজরদারি চালাবে নির্বাচন কমিশন

    • Author, ময়ূরী সোম
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করে তুলতে ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশন এবার কাজে লাগাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই)। রাজ্যের প্রত্যেকটি বুথে থাকবে অন্তত দুটি ক্যামেরা আর ওয়েবকাস্টিং সফটওয়্যার।

বুথ থেকে সরাসরি ভিডিও দেখতে পারবেন বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।

আর এই ওয়েবকাস্টিংয়ের কন্ট্রোল রুমে পর্যবেক্ষণের কাজে নিযুক্ত কর্মকর্তাদের জলদি সতর্ক করে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।

রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা (সিইও) মনোজ কুমার আগরওয়াল বুধবার একটি দীর্ঘ ভিডিও বৈঠক করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, বিদ্যুৎ সচিব, জেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং রাজ্যের পুলিশকর্তা ও জেলার এসপিদের সঙ্গে।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী এবং টেলিকম অপারেটরদের প্রতিনিধিরাও। সেই বৈঠকে জানানো হয়, নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনে পোলিং বুথ তদারকি নিয়ে কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে।

মি. আগরওয়াল পরে জানান, "আগে ৫০ শতাংশ বুথে ওয়েবকাস্টিং হত। এবার কমিশন প্রতিটি বুথে ওয়েবকাস্টিং করার নির্দেশ দিয়েছে। একটা ক্যামেরা ভেতরে থাকবে, একটা ক্যামেরা বাইরে থাকবে। প্রয়োজন হলে, অতি স্পর্শকাতর বুথে ৩৬০ ডিগ্রি পর্যবেক্ষণের জন্য ভেতরে আরও ক্যামেরা থাকতে পারে।"

এআই কীভাবে ব্যবহার করবে নির্বাচন কমিশন?

পশ্চিমবঙ্গে সব বিধানসভা কেন্দ্র মিলিয়ে মোট ৮০ হাজারের বেশি বুথ আছে। ভোটগ্রহণের দিনগুলিতে রাজ্যের যে বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে ভোট চলবে, সেরকম প্রতিটি বুথ থেকেই সরাসরি ভিডিও দেখতে পারবেন কর্মকর্তারা।

মি. আগরওয়াল বলেন, "আমরা তিন-চারটে প্যারামিটারের কথা মাথায় রেখে এআই ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যেমন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকায় উল্লেখ করা রয়েছে যে একটি বুথে একবারে চারজনের বেশি ভোটার থাকতে পারবে না।

"যেই মুহূর্তে একজন পঞ্চম ভোটার একটি বুথে ঢুকবে বা বুথে মানুষের ভিড় দেখা যাবে, বা যদি বিশৃঙ্খলা হয়, এআই আমাদের তৎক্ষণাৎ সতর্ক করে দেবে," বলছিলেন মি.আগরওয়াল।

তিনি আরও বলেন, "একইভাবে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম-এর) কাছে যদি একজনের বেশি ভোটার জড়ো হয়, এআই আমাদের মনিটরিং পর্দায় তৎক্ষণাৎ সেটি তুলে ধরবে।

"এমনকি, মেশিনে যদি কোনো সমস্যা হয়, আর বুথে উপস্থিত পোলিং কর্মকর্তা আর কোনো প্রযুক্তিবিদ যদি একসাথে ইভিএমের কাছে ভিড় করেন, তখনও আমাদের সতর্ক করে দেওয়া হবে। যদিও সেই ক্ষেত্রে আমাদের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার পড়বে না," জানিয়েছেন মি. আগরওয়াল।

তার বক্তব্য, যদি কোথাও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে বা ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় কোনো বিধি লঙ্ঘন করা হয়, সেখানে এআই-জনিত 'পপ-আপ নোটিফিকেশনের' সাহায্যে নির্বাচন কমিশন তৎক্ষণাৎ হস্তক্ষেপ করবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভময় মৈত্র বিবিসিকে বলেন, "নির্বাচন কমিশনের একটি বড় সমস্যা হলো তারা কথায় কথায় 'এআই' শব্দটি উল্লেখ করেন। কিন্তু ঠিক কোন এআই সফ্টওয়্যার ব্যবহৃত হচ্ছে, বা সেটি কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে অস্বচ্ছতা থেকেই যাচ্ছে।"

"তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে অটোমেশনের ঝুঁকি তুলনায় কম, কিন্তু এআই ব্যবহার করলে তা বাড়ে। অর্থাৎ 'এআই' শব্দটির অতিরিক্ত ব্যবহার সাধারণ মানুষকে অকারণে আতঙ্কিত করে। কমিশন নিশ্চয় তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিচ্ছেন, কিন্তু জনমানসে তার স্বচ্ছ্বতা কম।"

তিনি আরও বলেন, "রাজ্যের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের শুরুতেও নির্বাচন কমিশন এআই ব্যবহার করার কথা বলেছিলেন, কিন্তু ঠিক কীভাবে সেটা ভোটাধিকার নির্ধারণের কাজে ব্যবহার হচ্ছে, সে নিয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য দেননি।

"অনেক ক্ষেত্রে আমরা গল্প শুনেছি ব্যানার্জী-বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামের মিল খুঁজতেও নাকি এ-আই ব্যবহার করা হচ্ছে, যার আদৌ প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ ভোটারদের ফ্ল্যাগ করার ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা থাকলে সেখানে এ-আই এর দোহাই দেওয়া বিপজ্জনক। রাজনৈতিক দলগুলির উচিত নির্বাচনে এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্ন করা",বলছিলেন শুভময় মৈত্র।

প্রত্যেকটি বুথে থাকবে একাধিক লাইভ ক্যামেরা

নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য প্রশাসনের বুধবারের বৈঠকে ওয়েবকাস্টিং অর্থাৎ ক্যামেরার মাধ্যমে লাইভ পর্যবেক্ষণ করা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা বলেন, প্রতিটি বুথে একাধিক ক্যামেরার লাইভ ভিডিও ফিড নির্বাচনের দিনের পুরো সময়টা বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে যাবে।

কন্ট্রোল রুমগুলিতে একাধিক স্ক্রিনের মাধ্যমে সার্বিক নির্বাচনের লাইভ চিত্রটি মনিটর করবেন জেলা নির্বাচনী কর্মকর্তারা, মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দফতরও। প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন আইএএস এবং আইপিএস কর্মকর্তা প্রতি মুহূর্তে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কাজেই নিযুক্ত থাকবেন।

সিইও জানান, প্রথম দফার কেন্দ্রগুলিতে ওয়েবকাস্টিং-এর প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। নির্বাচনের দিনগুলিতে মক পোলও ওয়েবক্যাস্টিংয়ে ধরা পড়বে।

বুধবারের বৈঠকে ক্যামেরাগুলির নিরাপত্তা, তাদের উচ্চতা ও দৃষ্টিকোণ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান সিইও। ক্যামেরার মাধ্যমে ভোটগ্রহণ এবং পোলিং কর্মকর্তাদের কাজ তদারকি করা হবে। এমনকি যে কর্মকর্তা ভোটারদের আঙুলে কালি লাগাচ্ছেন, সেই কাজটি ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তার উপরও নজর থাকবে ক্যামেরার।

সিইও বলেন, "অনেক সময় আমরা দেখি ইভিএম মেশিনে ‌আতর লাগিয়ে দেওয়া হয় যাতে ভোটাররা কোন বোতাম টিপছেন তা জানা যায় বা ওয়েবক্যাস্টিং ক্যামেরায় চুইং গাম লাগিয়ে দেওয়া হয়, ক্যামেরার দৃষ্টিকোণ বদলে দেওয়া হয়। এই বছর এগুলোর কোনোটাই সহ্য করা হবে না।"

বৈঠকে রাজ্যে ৬৪২টি এমন বুথও চিহ্নিত করা হয়েছে যেগুলি 'শ্যাডো জোনের' অন্তর্গত। অর্থাৎ এই বুথগুলিতে ইন্টারনেট আর মোবাইল পরিষেবা দুর্বল।

তার মধ্যে ২৬২টির সমস্যা সমাধান করা গিয়েছে। 'শ্যাডো জোনের' বুথগুলিতে ওয়েবকাস্টিং ক্যামেরায় সিম কার্ড ভরা থাকবে এবং ভিডিও রেকর্ডিং সেই ক্যামেরাগুলিতেই সঞ্চয় করা থাকবে।

'বুথ নিয়ে সন্দেহ থাকলেই পুনর্নির্বাচন

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা আরও জানান, যদি নির্বাচনের সময়ে বহিরাগত বা উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিরা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে কোনো বুথ 'ক্যাপচার' করার চেষ্টা করে বা কোনো ভোটারের হয়ে অন্য কেউ ভোটপ্রয়োগ করার চেষ্টা করে, সেটি ওয়েবকাস্টিং-এ ধরা পড়বে।

তিনি বলেন, সেই ক্ষেত্রে দেশের নির্বাচনী আইন মেনে সেই বুথে পুনরায় নির্বাচন ঘোষণা করতে পিছপা হবে না নির্বাচন কমিশন।

"যদি কোনো বুথে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বৈধতা সম্পর্কে একটুও সন্দেহ থাকে, আমরা সরাসরি রি-পোলের সিদ্ধান্ত নেব। শান্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনে রিপোল ঘোষণা করতে একটুও ইতস্তত করবে না।"

কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা প্রথম দফার ভোটগ্রহণে

কমিশনের হিসেব অনুযায়ী, রাজ্যের প্রথম দফার ভোটে মোতায়েন করা হবে ২,৪০৭ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী। মুর্শিদাবাদ জেলায় সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে, ৩১৬ কোম্পানি। তার ঠিক পরেই রয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা, যেখানে মোতায়েন করা হচ্ছে ২৭৩ কোম্পানি।

১৮ই এপ্রিল থেকে বাহিনী মোতায়েন শুরু করা হবে।

রাজ্যের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পর, মুর্শিদাবাদ থেকে সব থেকে বেশি 'বিবেচনাধীন' ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়। যদিও সিইও জানান, তার সাথে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়নের কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির হেভিওয়েট শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচনে লড়ছেন।

গত ১৩ই এপ্রিল কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পোলিং কর্মকর্তাদের ভূমিকা সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর থেকে একটি নোটিশ জারি করা হয়।

তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, পোলিং টিমকে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে মিলে পুরো বুথ প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করতে হবে এবং বুথের একশো মিটার পরিধি, ভোটার অ্যাসিস্ট্যান্স বুথের অবস্থান, ভোটারদের সারির বিন্যাস এবং বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েনের জায়গা নির্ধারণ করতে হবে।

ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় কোনো বিধি লঙ্ঘন বা অনিয়ম দেখা দিলে প্রিসাইডিং অফিসারকে তৎক্ষণাৎ নির্বাচন কমিশনের অ্যাপের অ্যালার্ট সক্রিয় করতে হবে এবং প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় বাহিনীর টিমকে বুথের ভেতরে ডাকতে হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে সেক্টর অফিসারের মাধ্যমে অথবা সরাসরি রিটার্নিং অফিসারকে অবহিত করতে হবে।

রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা দেবাশীষ সেন বিবিসিকে বলেন, "এই নির্দেশিকা অনুযায়ী আমি মনে করি এই বছর কেন্দ্রীয় বাহিনীর দায়িত্ব অনেকটা বাড়ানো হয়েছে।"

"এটি একটি ভালো পদক্ষেপ, কারণ প্রায়শই প্রিসাইডিং অফিসার ভোটকেন্দ্রের ভেতরে বিধিবদ্ধ কাজে গভীরভাবে ব্যস্ত থাকেন। এখন এই দায়িত্বটি যৌথভাবে পালন করা হচ্ছে।"