নিখোঁজ বিমানসেনার খোঁজ পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অগ্নিপরীক্ষা

পড়ার সময়: ৪ মিনিট

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন যে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং দেশটি তার আকাশসীমায় পরিচালিত আমেরিকান বিমানগুলোর বিরুদ্ধে 'কিছুই করতে পারবে না'।

তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর 'আকাশ নিয়ন্ত্রণ' প্রতিষ্ঠা করেছে।

আর সেই কারণেই শুক্রবার এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়া ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় ধাক্কা।

এই ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান এখনো সীমিত সক্ষমতায় হলেও তার আকাশসীমা রক্ষা করতে সক্ষম।

তবে এই পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে আমেরিকার জন্য। যদিও নিখোঁজ বিমানসেনা কোন পক্ষের হাতে ধরা পড়েন কিংবা ধরা পড়েন নাকি উদ্ধার হন- তার ওপর।

বিবিসি জানতে পেরেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দল ওয়েস্ট উইং -এ তাকে একটি অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের বিষয়ে ব্রিফ করেছে।

ওই উদ্ধার অভিযানও ইরানে গোলাগুলির মুখে পড়ে। মার্কিন গণমাধ্যম জানিয়েছে,এতে ক্রু সদস্যরা আহত হলেও তারা ইরানের আকাশসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুরো ঘটনাকে সাদামাটা করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, গত ২৮ শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধ বন্ধে তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

তবে ধারণা করা হচ্ছে, ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের। বিশেষ করে যখন ইরানের বিপ্লবী গার্ড নিখোঁজ মার্কিন সদস্যকে খুঁজতে অভিযান শুরু করেছে এবং তাকে জীবিত ধরার জন্য সেনা ও স্থানীয়দের ব্যবহার করে প্রায় ৬৬ হাজার ডলার (৫০,০০০ পাউন্ড) পুরস্কার ঘোষণা করেছে।

যদি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী নিখোঁজ মার্কিন নাগরিককে খুঁজে পায়, তবে এর প্রভাব হতে পারে গভীর।

অন্ততপক্ষে, এটি ওয়াশিংটনের জন্য রাজনৈতিকভাবে একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করবে।

মার্কিন বিমানসেনাকে প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে, যা ১৯৭৯ সালের ইরান জিম্মি সংকটের ভয়াবহ স্মৃতিকে আবার সামনে নিয়ে আসবে।

তখন মার্কিন কূটনীতিকদের ৪৪৪ দিন ধরে আটক রাখা হয়েছিল।

একটি ব্যর্থ সামরিক উদ্ধার অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্র তখন কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ মুক্ত করে আটককৃতদের মুক্তি নিশ্চিত করেছিল।

এই ঘটনা তখন যুক্তরাষ্ট্রে গভীর রাজনৈতিক ক্ষত সৃষ্টি করেছিল।

এরপরেও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসনও ইরানের হাতে আটক মার্কিন নাগরিকদের মুক্ত করতে ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছে, কখনো কখনো বিতর্কিত পদ্ধতিও অবলম্বন করেছে।

উদাহরণস্বরূপ ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসন গুয়ানতানামো বে আটক শিবিরে আটক পাঁচজন তালেবান বন্দিকে বিনিময় করে বোয়ে বার্গদালকে মুক্ত করেছিল।

তাকে ২০০৯ সালে আফগানিস্তানে তালেবানরা বন্দি করেছিল। সমালোচকরা বলেন, এই ধরনের বিনিময় পরবর্তীতে জিম্মি করে নেওয়ার প্রবণতাকে উৎসাহিত করে।

এই ইতিহাসই বর্তমান হোয়াইট হাউসের সামনে কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরছে।

একজন মার্কিন সেনাসদস্য বন্দি হলে, তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর ওপর দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ বাড়াতে পারে, এমনকি সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আবার অন্যদিকে, এটি সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে থামিয়ে গোপন আলোচনার মাধ্যমে ওই বিমানসেনার মুক্তি নিশ্চিত করার সুযোগও তৈরি করতে পারে।

যদি নিখোঁজ মার্কিন নাগরিককে ইরান আটক করে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তবে এই অস্থির সংঘাতে তা ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

এখন পর্যন্ত যা ঘটছে, তা হলো নিখোঁজ বিমানসেনাকে খুঁজে বের করার জন্য মাঠ পর্যায়ে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের মধ্যে এক উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিযোগিতা চলছে।

ওদিকে ওয়াশিংটনে আইন প্রণেতারা প্রার্থনা করেছেন এবং তাদের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।

যদিও এ নিয়ে তাদের মধ্যে মতভেদও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান ন্যান্সি মেইস বলেছেন, "সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে, আমাদের সেনাদের দেশে ফিরিয়ে আনা উচিত।"

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর টিম কেইনে কোনো বিমানসেনা আটক হলে তাকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় মানবিক আচরণ করতে ইরানের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

এই সংঘাতে মার্কিন সামরিক সদস্যদের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, বিশেষ করে সম্ভাব্য স্থল আক্রমণের আলোচনা সামনে আসায়।

রাজনৈতিক বিভাজন থাকলেও কথিত চিরস্থায়ী যুদ্ধ বা আরও মার্কিন সেনা হতাহত হোক, এমন অবস্থার প্রতি আগ্রহ খুবই কম।

শনিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্ধারিত সময়সীমা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, ইরানকে সোমবার অর্থাৎ ৬ই এপ্রিলের মধ্যে একটি চুক্তিতে সম্মত হতে হবে এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে হবে।

অন্যথায় 'ভয়াবহ পরিণতি' ভোগ করতে হবে, যার মধ্যে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলাও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে বলেছেন তিনি।

যদিও তার নির্ধারিত সময়সীমাগুলো বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। আবার তিনি এ-ও দাবি করেছেন যে, চলমান আলোচনা 'খুব ভালো' এবং 'ফলপ্রসূ' হচ্ছে।

তবে তেহরান এমন কোনো আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে।

আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও মার্কিন হামলার সম্ভাবনা, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ট্রাম্পের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য আরও মার্কিন হতাহতের সতর্কবার্তা- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যে উত্তেজনার দিকে এগোচ্ছে, তারই স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।