বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড যখন রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর প্ল্যাটফর্ম

    • Author, নাগিব বাহার
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

মাঠের খেলায় তেমন একটা সাফল্য না থাকলেও গত দুই যুগের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেটই ছিল জাতিগত, ধর্মীয় আর দলীয় পরিচয় ভুলে বাংলাদেশি হিসেবে সবার একসাথে উদযাপনের অন্যতম উপলক্ষ্য।

সেই ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদ চার বার পরিবর্তন হয়েছে গত দুই বছরের কম সময়ে – প্রতিবারই এই পরিবর্তনের পেছনে রাজনীতি ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ওপর বিভিন্ন পক্ষের রাজনৈতিক প্রভাব সবসময়ই ছিল। কিন্তু গত দুই বছরে রাজনৈতিক প্রভাবে ক্রিকেট বোর্ডে অস্থিরতা দেখা গেছে।

২০২৪ সালের অগাস্টে বাংলাদেশের ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর নাজমুল হাসান পাপনের দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়া দিয়ে শুরু।

এরপর সভাপতির আসনে বসা ফারুক আহমেদকে নিয়ে নয় মাসের মাথায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন বোর্ডের পরিচালকরা আর অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা। ফলস্বরুপ তড়িঘড়ি করে ফারুক আহমেদকে অপসারণ করা হয় এবং তার জায়গায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি করে।

আমিনুল ইসলাম বুলবুল মাস তিনেকের বেশি সময় অনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট থেকে ২০২৫ এর অক্টোবরে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হন, যেই নির্বাচনে রাজনৈতিক 'হস্তক্ষেপ' থাকার অভিযোগ 'প্রমাণিত' হওয়ার কথা উল্লেখ করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তদন্ত কমিটি ঐ নির্বাচিত কমিটি ভেঙে দিয়েছে এবং তামিম ইকবালকে প্রধান করে নতুন অ্যাডহক কমিটি ঘোষণা করেছে।

ক্রিকেট বোর্ডে রাজনীতির প্রভাব

অক্টোবরের বিসিবি নির্বাচন আর সম্প্রতি ঘোষণা করা অ্যাডহক কমিটি গঠনের পেছনে যে পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক পক্ষের প্রভাব ছিল, তা অনেকটাই স্পষ্ট বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন।

অক্টোবরের ঐ নির্বাচন ঘিরে অনেকটা প্রকাশ্যেই দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিলেন বিএনপির নেতা ইশরাক হোসেন আর তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা এনসিপির আহ্বায়ক আসিফ মাহমুদ। নির্বাচনের কিছুদিন আগে প্রেস কনফারেন্স করে 'অনিয়মের' এবং তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের 'হস্তক্ষেপের' অভিযোগ তোলেন তামিম ইকবাল, যেখানে তার সাথে ইশরাক হোসেন সহ বিএনপি সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন ছিলেন।

মজার বিষয় হলো, ঐ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে তামিম ইকবাল সহ বেশ কয়েকজন নিজেদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন, যাদের অনেকেই বিএনপি নেতাদের পরিবারের সদস্য বা বিএনপি সমর্থিত হিসেবে পরিচিত। এবার তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিটিতে থাকা এগারোজনের মধ্যে অন্তত চারজন বিএনপি নেতাদের পরিবারের সদস্য রয়েছেন।

আমিনুল ইসলাম বুলবুল অবশ্য অ্যাডহক কমিটি ঘোষণার পর রাতেই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নতুন গঠন করা কমিটিকে 'অবৈধ' ও 'আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য' হিসেবে দাবি করেছেন। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এর হস্তক্ষেপও দাবি করেছেন তিনি।

আবার যেই আসিফ মাহমুদ নির্বাচনে প্রভাব খাটিয়েছিলেন বলে অভিযোগ, তিনি তদন্ত কমিটির সামনে হাজিরই হননি। এর কারণ হিসেবে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, এই তদন্ত বেআইনি ও মন্ত্রণালয়ের 'এখতিয়ার নেই' স্বায়ত্বশাসিত বোর্ডের কার্যক্রমে তদন্ত করার।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলেও কিন্তু আমিনুল ইসলাম বুলবুলের অভিযোগের কারণটা বোঝা যায়। তদন্ত কমিটির ১১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের নবম পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে যে ক্রিকেট বোর্ডের 'সংবিধান মৌলিকভাবে যথেষ্ট নয় যাতে স্বাধীন, ন্যায্য ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করা যায়' এবং সংবিধানের 'কাঠামোগত দুর্বলতা এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যেখানে সনাক্তকৃত অনিয়মগুলো ঘটতে সুযোগ পেয়েছে।'

অর্থাৎ, তদন্ত কমিটির দাবি অনুযায়ী. নির্বাচনে অনিয়ম হয়ে থাকলেও তা বিসিবির গঠনতন্ত্র মেনেই হয়েছে, আর সেক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করার আগে নির্বাচিত কমিটি ভেঙ্গে দেয়া ও নতুন অ্যাডহক কমিটির নিয়োগ কতটা আইনসম্মত হয়েছে, সে প্রশ্ন খুব একটা অযৌক্তিক নয়।

আবার অক্টোবরের নির্বাচন বিসিবির গঠনতন্ত্র মেনে অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে যে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়েছিল, তাও অনেকটা 'ওপেন সিক্রেট।'

সংসদেও আলোচনা

বিসিবির নতুন অ্যাডহক কমিটি ঘোষণা এতোটাই সমালোচনা তৈরি করেছে যে সংসদ অধিবেশনেও এ বিষয়ে আলোচনা উঠেছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণের বিল নিয়ে আলোচনার সময় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন যে বিসিবি 'বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ডে' পরিণত হয়েছে।

এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা 'ক্ষমতার প্রয়োগ করে সারা বাংলাদেশের জেলা কমিটিকে প্রভাবিত করে' এবং ক্ষমতার প্রয়োগ করে 'একতরফাভাবে' বোর্ডের কমিটি তৈরি করেছিলেন।

মি.আহমদ এ-ও বলেন, 'আমরা এখানে কোনো মায়ের দোয়া, বাপের দোয়া করি নাই।'

শুধু গত দুই বছরেই নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডে সবসময়ই রাজনীতির প্রভাব ছিল বলে বলছেন একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্রীড়া সম্পাদক তাহমিদ অমিত। তবে অক্টোবরের নির্বাচন ও সম্প্রতি অ্যাডহক কমিটি গঠনের ক্রিকেটারদের ভাবমূর্তিকে সামনে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে বলছিলেন তিনি।

"বোর্ডে রাজনীতিকরণ আগে থেকেই ছিল। আওয়ামী লীগ আমলে নাজমুল হাসান পাপন বা তার আগে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন আলী আসগর লবী ক্ষমতাসীন দলের সমর্থন নিয়েই সভাপতি হয়েছিলেন। "

"কিন্তু অক্টোবরের নির্বাচনের আগে যেমন আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে সামনে রেখে নির্বাচনে প্রভাব খাটিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা, এবারও তামিম ইকবালের ইমেজকে ব্যবহার করা হয়েছে ক্রিকেট বোর্ডে প্রভাব তৈরির উদ্দেশ্যে", বলছিলেন তিনি।

অ্যাডহক কমিটির প্রধান হিসেবে নাম ঘোষণার পরপরই তামিম ইকবাল ক্রিকেট বোর্ডে যান এবং পরবর্তী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা বলেন। এর ফলে বিসিবির পরবর্তী নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে বলছিলেন তিনি।

"এই বোর্ডটি (অ্যাডহক কমিটি) একটি নির্বাচনকালীন বোর্ড। বলা হয়েছে যে তিনমাসের মধ্যে নির্বাচন দেবে এই বোর্ড। এই বোর্ডের প্রধান প্রথমদিন বোর্ডে এসেই বললেন যে তিনি নির্বাচন করবেন। তাহলে অন্য যারা নির্বাচন করবে তাদের জন্য কি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে?", বলছিলেন তাহমিদ অমিত।

এই প্রক্রিয়া বোর্ডে রাজনীতিকরণের 'নতুন ধারা' তৈরি করবে বলে বলছিলেন এই ক্রীড়া সাংবাদিক।

আইসিসি কী পদক্ষেপ নিতে পারে?

মঙ্গলবার তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পেশ করার সময় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক উল্লেখ করেন যে, নির্বাচনে অনিয়ম ও তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি আইসিসিকে অবহিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে আমিনুল ইসলাম বুলবুলও তার প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছেন যে, এ বিষয়ে আইসসিসির শরণাপন্ন হবেন তিনি।

তবে এই বিষয়ে আইসিসি কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা, তা আমিনুল ইসলাম বুলবুলের অভিযোগ বা ক্রীড়া পরিষদের বক্তব্যের ওপর খুব একটা নির্ভর করবে না বলে মনে করেন ক্রীড়া সাংবাদিক তাহমিদ অমিত।

"আইসিসির একটি আলাদা সংস্থা আছে, যারা প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের ক্রিকেটীয় কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। কেউ অভিযোগ না দিলেও তারা নিজেদের মতো করে স্বাধীনভাবে তারা সেসব বিষয়ে খোঁজখবর রাখে।"

তবে এই ঘটনায় আইসিসি কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা- তা জানতে আরো অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

উদাহরণ হিসেবে তিনি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের টানাপোড়েনের ইতিহাস উল্লেখ করেন। তিনি বলছিলেন, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের কমিটি না ভাঙলেও অনেকবার বোর্ডের শীর্ষ পদে পরিবর্তন এসেছে এবং অনেকবারই আইসিসি পদক্ষেপ নেয়নি।

কাজেই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আইসিসি কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা, তা ক্রীড়া পরিষদের সাথে আইসিসির সমঝোতার ওপর নির্ভর করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।