সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি কীভাবে কার্যকর হবে?

    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালু করতে চায় সরকার। বিদ্যমান চারটি স্কিম থাকার পরও কেন শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির প্রয়োজন হলো, এটি কীভাবে চলবে, কতটা কার্যকর হবে- এমন নানা প্রশ্ন সামনে আসছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশের অধিক সংখ্যক মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে প্রচলিত সুদভিত্তিক কাঠামোর পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়াতে পেনশন স্কিমে মুনাফার হার বৃদ্ধি এবং পেনশনারের সুবিধাভোগীর বয়সসীমা বাড়ানোসহ নানা উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

পেনশন কর্তৃপক্ষের মতে, শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালু করার মাধ্যমে সর্বজনীন পেনশনে বিভিন্ন ধরনের গ্রাহককে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

যদিও এই পদ্ধতি চালুর ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ দেখছেন অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ।

তারা বলছেন, শরিয়াহভিত্তিক ফান্ড বিনিয়োগের মডেল কী হবে, মানুষ এখানে আর্থিক নিরাপত্তা কতটা পাবে- এমন নানা বিষয়ের ওপরই নির্ভর করছে গ্রাহকদের আস্থা অর্জনের বিষয়টি।

কেন শরিয়াহভিত্তিক উদ্যোগ?

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন এর চারটি স্কিমে এখন পর্যন্ত মোট নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজার।

আর এই কর্মসূচিতে জমা হওয়া প্রায় ৩২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির চারটি স্কিমের মধ্যে সমতা স্কিমে সর্বোচ্চ দুই লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন নিবন্ধন করলেও, বাকি তিনটিতে (সুরক্ষা, প্রবাস ও প্রগতি) এখনো নিবন্ধনকারীর সংখ্যা বেশ কম।

এমন প্রেক্ষাপটে সরকারি এই উদ্যোগে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়াতে নতুন প্যাকেজ হিসেবে সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি যুক্ত করতে চায় জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।

গত ১৭ই সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ বৈঠকে এই প্রস্তাব অনুমোদনের পর থেকেই এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

নতুন এই পদ্ধতির আইনগত ভিত্তি তৈরিতে আইনের খসড়া প্রণয়ন করে তা জাতীয় সংসদে পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ কামরুল হাসান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, শরিয়াহভিত্তিক স্কিম কোনো আলাদা পঞ্চম স্কিম নয় বরং বিদ্যমান চারটি স্কিমেরই ইসলামিক ভার্সন।

"প্রবাস স্কিমের প্রবাস শরিয়া বলে আরেকটা পার্ট থাকবে। একইভাবে প্রগতি, সুরক্ষা এবং সমতা স্কিমের ক্ষেত্রেও থাকবে। অর্থাৎ এই চারটাতেই লোকজন ইচ্ছা করলে প্রচলিত যে মুনাফার সিস্টেম সেটাতেও ঢুকতে পারবে, অথবা শরিয়াহ পদ্ধতির ভেতরেও ঢুকতে পারবে," বলেন তিনি।

অর্থাৎ গ্রাহকের সামনে দুটি অপশন থাকবে- প্রচলিত মুনাফা পদ্ধতি অথবা শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি। কেউ যদি সুদ নিতে আগ্রহী না হন, তিনি শরিয়াহ পদ্ধতি বেছে নিতে পারবেন।

পেনশন কর্তৃপক্ষ বলছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি ও স্থানীয় পরামর্শকেরা- কাঠামো, পরিচালন পদ্ধতি, বিনিয়োগ ব্যবস্থা ও কারিগরি বিষয় নির্ধারণে কাজ করছেন। পাশাপাশি এর আর্থিক স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয়টি নিয়েও বিশ্লেষণ করা হবে।

এছাড়া শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর ক্ষেত্রে আলাদা কোনো শরিয়া বোর্ড গঠন করা হবে কি না, সুকুক বন্ডসহ কোন কোন জায়গায় বিনিয়োগ করা যায় - এসব বিষয়ে এখন পর্যালোচনা চলছে বলে জানান মি. হাসান।

"বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়া বোর্ড এবং সরকারের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত শরিয়া অথরিটি আছে, তাদের কাছ থেকেই আপাতত পরামর্শ নেওয়া হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

কতটা কার্যকর, চ্যালেঞ্জ যেখানে

সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালু চলে এই কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়তে পারে, তবে এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা।

প্রচলিত পেনশন তহবিল সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট হারে সুদ পায়। কিন্তু, শরিয়াহ তহবিল সুদ নিতে পারবে না। তাহলে বিনিয়োগ হবে কোথায়?

অর্থাৎ শুধু নামে শরিয়াহ বললে হবে না, গ্রাহককে বিশ্বাস করাতে হবে যে তার টাকা সত্যিই সুদমুক্ত ও হালাল খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের খারাপ অবস্থার কারণে শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকিং নিয়ে বাংলাদেশে যে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে সেটিও দূর করা জরুরি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট বা বিআইবিএম এর অধ্যাপক মো. আহসান হাবীব বলছেন, সর্বজনীন পেনশনে প্রডাক্ট ভ্যারিয়েশন বা পণ্যের বৈচিত্র্য না আনলে সবাইকে এই ফোল্ডারে আনা যাবে না।

"দেশে এক শ্রেণির মানুষ সুদভিত্তিক পেনশন স্কিমের বিষয়টি গ্রহণ না করে বরং এটি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

তবে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিসহ দেশের আর্থিক খাতে গ্রাহকদের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা মেটানোর জন্য পণ্যের বৈচিত্র্য আনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করেন তিনি।

শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি কতটা কার্যকর বা সফল হবে, সেটি মোটাদাগে তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে বলেই মনে করেন আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, শরিয়াহসম্মত সুকুক বন্ড (যেখানে সুদের হার নির্ধারিত থাকে না), ইসলামিক ইক্যুইটি (শরিয়াহসম্মত ব্যবসা বা শেয়ারে বিনিয়োগ), হালাল ব্যবসায় মুদারাবা বা মুশারাকা মডেলে বিনিয়োগ করতে হবে।

কিন্তু বাংলাদেশে সুকুকের বাজার এখনো ছোট। ফলে হালাল বিনিয়োগের পর্যাপ্ত উপকরণ তৈরি করা না গেলে, মুনাফা প্রচলিত স্কিমের চেয়ে কম হতে পারে, যা গ্রাহককে নিরুৎসাহিত করবে।

এছাড়া গ্রাহকের আস্থা অর্জনে শক্তিশালী ও স্বাধীন শরিয়াহ বোর্ড, শরিয়াহ অডিট এবং স্বচ্ছ প্রতিবেদন জরুরি বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আহসান হাবীব।

তিনি বলছেন, অতীতে কিছু ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ ব্যাংকিং মডেল নয়, বরং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।

"পলিটিকাল পার্টির সঙ্গে ব্যাংককে ট্যাগ করা হয়েছে, রাজনৈতিকভাবে দখল হয়েছে। ফলে অনেক ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলোর জন্য ব্যাংকিং সিস্টেম দায়ী ছিল না, এক্সটার্নাল ফোর্সেস দায়ী," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

আরও যেসব পরিবর্তন

শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতিকে- বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থার বিনিয়োগ কাঠামো, অংশগ্রহণের পরিধি ও সুবিধার ধরন আরও বিস্তৃত করার চলমান উদ্যোগের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ কামরুল হাসান বলছেন, আইনগত কাঠামো চূড়ান্ত করে জাতীয় সংসদে পাঠানো এবং পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ওপরই এর বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে।

তার মতে, সঠিক বিনিয়োগ নীতি, স্বচ্ছ শরিয়াহ ব্যবস্থাপনা এবং প্রচারণা নিশ্চিত করা গেলে সুদ-এড়িয়ে চলা বড় জনগোষ্ঠীকে সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

শরিয়াহভিত্তিক স্কিমের পাশাপাশি পেনশন কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান ব্যবস্থায় আরও কিছু সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে আগ্রহ বাড়ে।

আগের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পেনশনার মারা গেলে তার স্বামী বা স্ত্রী ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পেতেন। এখন তা বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়েছে। পেনশনার নিজে তার জীবদ্দশায় আজীবন পেনশন পাবেন।

পেনশন স্কিমে মুনাফার হার বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকারি মালিকানাধীন যেসব প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির কর্মীরা প্রচলিত সরকারি পেনশন পান না, তাদেরকে 'প্রগতি' স্কিমের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রবাস স্কিমে গ্রাহক বাড়াতে, বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের 'প্রবাস' স্কিম সম্পর্কে অবহিত করা এবং বিমানবন্দরেই নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে নিবন্ধনে আগে ১৫ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হতো, যা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।

এছাড়া পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করা, তহবিল থেকে ঋণ দেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করা যায় কি না এসব বিষয়েও পর্যালোচনা করছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।