আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
সূর্যগ্রহণ ইউরোপ থেকে যেমন দেখা গেলো
- Author, মার্ক পয়েন্টিং, পল্লব ঘোষ, রেবেকা মোরেল, অ্যালিসন ফ্রান্সিস ও এসমে স্ট্যালার্ড
- Role, বিবিসি ক্লাইমেট অ্যান্ড সায়েন্স টিম
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর সূর্যগ্রহণ উপভোগ করেছে ইউরোপ। ধারণা করা হচ্ছে, এক প্রজন্মে একবার দেখা মেলা এমন এই ঘটনা দেখার সুযোগ পেলেন লাখো মানুষ।
যুক্তরাজ্য থেকে যারা এই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাটি দেখেছেন, তারা আংশিক সূর্যগ্রহণের সাক্ষী হয়েছেন। এটি ব্রিটিশ সামার টাইম (বিএসটি) অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টার কিছু পরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন অধিকাংশ মানুষ সূর্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি অংশ চাঁদের আড়ালে ঢাকা থাকতে দেখেন।
তবে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও স্পেনের কিছু অংশে সম্পূর্ণ অন্ধকার নেমে আসে এবং সেখানে পূর্ণ সূর্যগ্রহণের দৃশ্য দেখা যায়।
যুক্তরাজ্য ও ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন দর্শনস্থলে জড়ো হওয়া বড় বড় জনসমাগম বিস্ময় ও উচ্ছ্বাসে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুরাগীরা বলেছেন, এটি মহাবিশ্ব কতটা 'অসাধারণ' তা মনে করিয়ে দিয়েছে।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণের পথচলা শুরু হয় রাশিয়ার সাইবেরিয়ার উত্তর প্রান্ত থেকে, জনসমাগম ও টেলিস্কোপ থেকে অনেক দূরে।
এরপর এটি আর্কটিক মহাসাগরের চারপাশ দিয়ে বাঁক নিয়ে সন্ধ্যার শুরুতে আইসল্যান্ডে পৌঁছে এবং পরে দক্ষিণমুখী হয়।
উত্তর স্কটল্যান্ডে সন্ধ্যা ৬টার দিকে এবং ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের ঠিক আগে আংশিক সূর্যগ্রহণ শুরু হয়।
প্রথমদিকে এটি বোঝা যাচ্ছিল না, কিন্তু যাদের আকাশ ছিল মেঘমুক্ত, তারা দেখতে পান চাঁদ ধীরে ধীরে সূর্যের অংশ ঢেকে ফেলছে।
মধ্য ও দক্ষিণ ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের বেশিরভাগ এলাকা পরিষ্কার আকাশ উপভোগ করেছে, ফলে তারা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চাঁদের ধীরগতিতে সূর্যের ওপর দিয়ে অতিক্রম করার দৃশ্য স্পষ্টভাবে দেখতে পেয়েছে।
উত্তর ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে আকাশ বেশি মেঘাচ্ছন্ন ছিল, তবে তাতে দেশের বিভিন্ন বিখ্যাত স্থানে মানুষের ভিড় জমতে বাধা সৃষ্টি হয়নি।
কেউ কেউ সূর্যগ্রহণ দেখার বিশেষ চশমা সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। তবে সূর্গ্রযহণ শুরুর আগেই দোকানগুলোয় চোখ সুরক্ষার উপকরণের তীব্র চাহিদা ছিল এবং সব বিক্রি হয়ে যায়।
তবে এতে মানুষ নিরুৎসাহিত হননি। নিরাপদে আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য তারা ছিদ্রযুক্ত ঝাঁঝরি, সিরিয়ালের বাক্স এবং কাগজ ব্যবহার করেছেন।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে এসে পড়ে। এতে সূর্যের কিছু বা সব আলো বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং পৃথিবীর ওপর ছায়া পড়ে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদ ধীরে ধীরে আরও বেশি সূর্যালোক আড়াল করে।
যুক্তরাজ্য থেকে দেখলে সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী পুরোপুরি এক সরলরেখায় ছিল না। ফলে সেখানে আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ স্থানে চাঁদ সূর্যের প্রায় ৯০ শতাংশ ঢেকে ফেলে, যা ১৯৯৯ সালের পর দেশটির সবচেয়ে নাটকীয় সূর্যগ্রহণ।
কর্নওয়ালে এই হার ছিল সর্বোচ্চ ৯৫ শতাংশ।
স্পেনের কিছু অঞ্চল আরও বেশি বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছে।
স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৩০ মিনিটে সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী পুরোপুরি এক সরলরেখায় অবস্থান নেয়, ফলে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটে।
প্রসঙ্গত, ইউরোপের দেশগুলোয় এখন গ্রীষ্মকাল হওয়ায় সাড়ে আটটা থেকে শুরু করে আরো পরেও সূর্য অস্ত যায়।
চিলির বিজ্ঞানী ইয়াসমিন ক্যাট্রিচেও এই ঘটনা দেখার জন্য হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে উত্তর-পশ্চিম স্পেনের আ কোরুনিয়ায় গিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, "পূর্ণ গ্রহণের সময় সবাই উচ্ছ্বাসে চিৎকার করছিল এবং যা দেখছিলাম সেই উত্তেজনা ভাগাভাগি করছিল। সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
"মহাবিশ্ব অসাধারণ।"
পৃথিবীর কোথাও না কোথাও প্রায় প্রতি ১৮ মাসে একবার পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে এটি অনেক বেশি বিরল, সাধারণত প্রায় ৪০০ বছরে একবার ঘটে।
স্পেনে পূর্ণ সূর্যগ্রহণের পথের মধ্যে থাকা মানুষ সেই বিরল দৃশ্য দেখার সুযোগ পেয়েছেন। চাঁদের আড়ালে থাকা সূর্যের পেছন থেকে লাল আভাও দেখা গেছে।
অন্ধকারের মধ্য থেকে যে আলো বের হচ্ছিল, তা ছিল সূর্যের করোনার আলো, যা অত্যধিক উত্তপ্ত গ্যাসের প্রবাহ হিসেবে হাজার হাজার মাইল মহাকাশে ছড়িয়ে যায়।
আর যারা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন, তারা হয়তো সূর্যের অস্থির চৌম্বক ক্ষেত্র অনুসরণ করা গোলাপি রঙের ছোট গ্যাসীয় লুপ, যেগুলোকে প্রমিনেন্স বলা হয়, সেগুলোও দেখতে পেয়েছেন।
এরপর চাঁদ ধীরে ধীরে যে সূর্যকে আড়াল করেছিল, সেটিকে আবার উন্মোচন করতে শুরু করে।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণ স্থায়ী হয়েছিল দুই মিনিটেরও কম সময়, কিন্তু অনেকের জন্য সেটি ছিল অবিস্মরণীয়।
আমরা যে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখতে পারি, সেটি আসলে এক বিস্ময়কর মহাজাগতিক কাকতালীয় ঘটনা।
সূর্য পৃথিবী থেকে ১৫ কোটি কিলোমিটার (৯ কোটি ৩০ লাখ মাইল) দূরে অবস্থিত, যা চাঁদের তুলনায় ৪০০ গুণ বেশি দূরে।
কিন্তু চাঁদের ব্যাস সূর্যের ব্যাসের তুলনায় ৪০০ গুণ ছোট হওয়ায়, আমাদের আকাশে দুটিকে একই আকারের মনে হয়।
চাঁদ যদি সামান্য ছোট হতো, অথবা তার কক্ষপথ পৃথিবী থেকে একটু বেশি দূরে থাকত, তাহলে আমরা কখনো পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখতে পেতাম না।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে আমরা পূর্ণ সূর্যগ্রহণের একটি "সোনালি যুগে" প্রবেশ করতে যাচ্ছি।
পরবর্তী কয়েক বছরে তিনটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণের বিস্ময়কর দৃশ্য দেখতে মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতে পারবেন।
তবে এর কোনোটিই যুক্তরাজ্য থেকে দেখা যাবে না। দেশটিতে ২০২৭ সালে একটি আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে, যখন কিছু অঞ্চলে প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত আবরণ দেখা যাবে।
বুধবারের গ্রহণের চেয়ে আরও বেশি পূর্ণতার সূর্যগ্রহণ দেখতে যুক্তরাজ্যকে কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হবে।
সেটি হবে ২০৮১ সালে, যখন সূর্যের সর্বোচ্চ ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত ঢাকা পড়বে।
আর যুক্তরাজ্যে পরবর্তী পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হবে ২০৯০ সালে।
অতিরিক্ত প্রতিবেদন: জর্জ বার্ক